এক দিনে সীমান্তের ১১ পয়েন্টে ১২৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা
সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা, পুশইন রুখে দিয়েছে বিজিবি
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক, ঢাকা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ২৩:০৬
সীমান্তের ১১ পয়েন্ট দিয়ে ১২৯ জনকে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। গত ২৪ ঘণ্টায় চালানো পুশইনের এই চেষ্টা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রুখে দিয়েছে।
বিজিবি জানিয়েছে, দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্ক তারা। সম্ভাব্য পুশইন প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি যে কোনো পুশইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। সীমান্তে নজরদারি, টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে তারা।
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যেসব জেলার সীমান্তের ১১টি পয়েন্ট দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে সেগুলো হলো– চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, খুলনা ও ঝিনাইদহ।
বিজিবি জানায়, ঝিনাইদহে মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) যাদবপুর সীমান্ত এলাকায় চার থেকে পাঁচ ব্যক্তি বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিজিবি টহল দল তাৎক্ষণিক বাধা দেয়। বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের মুখে তারা ফের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যায়।
এদিকে, মহেশপুর এলাকায় বিএসএফের একটি প্রিজন ভ্যানে করে ৩০ থেকে ৩৫ ব্যক্তিকে সীমান্ত গেট খুলে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি টহল দল ও স্থানীয় বাসিন্দার তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের ফের ভ্যানে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
খুলনা ব্যাটালিয়নের (২১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত এলাকায় কয়েকজন নারী-পুরুষকে পুশইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছে অবস্থান করতে দেখা যায়। বিজিবির প্রতিরোধমূলক তৎপরতায় বিএসএফ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
জয়পুরহাট ব্যাটালিয়নের (২০ বিজিবি) কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরে অন্তত ১০ ব্যক্তিকে একত্র করে পুশইনের প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া যায়। পুশইন প্রতিরোধে বিজিবির তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক প্রস্তুতি এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ার কারণে পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) সীমান্তের বিপরীতে ১৪৯ ও ৭১ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ ক্যাম্পের কাছাকাছি তিনটি হোল্ডিং সেন্টারে চার মুসলিম নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে বলে গোয়েন্দা ও সামাজিক মাধ্যম সূত্রে জানা যায়। বিজিবি সেখানে কঠোর অবস্থান ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে।
ঠাকুরগাঁও ব্যাটালিয়নের (৫০ বিজিবি) হরিপুর সীমান্তের বিপরীতে ৮৭ ব্যাটালিয়ন বিএসএফের কাকরমনি ক্যাম্পের টহল দল দুই বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে নিজেদের হেফাজতে রেখেছে। এ ব্যাপারে বিএসএফের তরফে বিজিবির সঙ্গে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি।
পঞ্চগড় ব্যাটালিয়নের (১৮ বিজিবি) রওশনপুর সীমান্তে বিএসএফ এক ব্যক্তিকে পুশইন করতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে আটক করে বিজিবিকে জানায়। পরে বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠায়।
মহানন্দা ব্যাটালিয়নের (৫৯ বিজিবি) চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের মালদা জেলার ইংলিশ বাজার থানাধীন চন্দন পার্ক নামক স্থানে ভারতীয় পুলিশের স্থাপিত একটি হোল্ডিং সেন্টারে আটক ২২ জনকে পুশইনের লক্ষ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের তথ্য পাওয়া যায়। বিজিবি সেখানে কড়া নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।
সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) উৎমাছড়া সীমান্ত এলাকায় সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে স্থানীয় বাসিন্দারা আটক করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভারতে পুশব্যাক করা হয়।
নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানাধীন বলিশী গীতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫ থেকে ২০ ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে জড়ো করে রাখা হয়েছে। সীমান্তের একটি অংশে প্রাকৃতিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় ওই এলাকা দিয়ে পুশইনের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
২৮ জন শূন্যরেখায়
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে দুদফা পতাকা বৈঠকেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বিএসএফের ২৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। অন্যদিকে জনবল বাড়ানোসহ সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও তৎপরতা বাড়িয়েছে বিজিবি।
সরেজমিন দেখা যায়, পুশইন হওয়া ওই সব নারী-পুরুষ খোলা আকাশের নিচে জঙ্গলের মধ্যে অবস্থান করছে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলেও তাদের সেখানেই বাধ্য হয়ে অবস্থান করতে হচ্ছে। তাদের অবস্থানের একপাশে কাঁটাতারের ওপারে বিএসএফ, অন্যপাশে বিজিবি পাহারা দিচ্ছে।
বিজিবি জানায়, বৃহস্পতিবার ভোর ৩টার দিকে গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের সীমান্তের ২০৩/৬-আর পিলারে বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার সময় এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে ২৮ জনই শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। এদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ, ১০ নারী ও ৬ শিশু রয়েছে।
বিজিবি জানায়, বৃহস্পতিবার ভোর ৩টার দিকে বাঙ্গাবাড়ী বিওপির সদস্যরা খবর পেয়ে ওই সীমান্ত এলাকায় যান। তারা জানতে পারেন, ভারতীয় ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা ২০৩/৬-আর পিলারে কাছ দিয়ে ২৮ ব্যক্তি বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। পরে বিওপির সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের ভারতীয় সীমান্তের শূন্যরেখার মধ্যে অবস্থান শনাক্ত করে।
বিজিবি আরও জানায়, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে পুশইন করা ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, সকালের দিকে ওই ২৮ জন সীমান্ত পার হয়ে তাদের গ্রামের দিকে আসার সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হলে বিজেবিকে খবর দেয়। পরে বিজিবি তাদের শূন্যরেখার ওপরে পার করে দেয়। আনারপুর গ্রামের ওয়াসিম আকরাম জানান, রাতে বিএসএফ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কিছু মানুষকে কাঁটাতারের বেড়া খুলে বাংলাদেশের ঠেলে দিয়েছে। এখন তারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। যদি তারা প্রকৃত বাংলাদেশিও হয়, তাহলে তারা সরকারের মাধ্যমে পাঠাত। এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম অন্যায়।
১৬ বিজিবি নওগাঁ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম জানান, প্রথমে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে ও পরে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে দুটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সিদ্ধান্ত ছাড়াই মিটিং শেষ হয়। বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ২৮ ব্যক্তিকে ফের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাদ্দাম হোসেন জানান, তিনি ভোর ৫টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওই সময় বিজিবির টহল লক্ষ্য করেছি। তবে শূন্যরেখায় অবস্থানকারী ওই সব নারী-পুরুষের পাশে কোনো বিএসএফ সদস্যকে তিনি দেখতে পাননি।
