ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

গবেষণায় বরাদ্দ বাড়লেও মান বাড়েনি

গবেষণায় বরাদ্দ বাড়লেও মান বাড়েনি
×

 জবি সংবাদদাতা

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে গবেষণা। তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) গবেষণার ক্ষেত্রে সেই চিত্র ভিন্ন। কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দুই দশক পার হয়েছে। গবেষণায় বরাদ্দ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত গুণগত অগ্রগতি হয়নি। আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশের সংখ্যা ও মান আশানুরূপ নয়।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত শতাধিক শিক্ষক কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে গবেষণা কার্যক্রমে অংশ নেন অর্ধেকেরও কম। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষক গবেষণার পরিবর্তে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া কিংবা কনসালট্যান্সি কাজে বেশি সময় দেন। গত আট বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিবছর গড়ে ১৭৫টি গবেষণা প্রস্তাব জমা পড়ে। প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষে তুলনামূলক কম প্রস্তাব অর্থায়নের জন্য নির্বাচিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সেল সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক কয়েক অর্থবছরে গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গবেষণা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা। গবেষণা প্রস্তাব জমা পড়েছে ২১৬টি। এর মধ্যে ২১১টি অর্থায়নের অনুমোদন পেয়েছে। ইতোমধ্যে ১৮৫টির অর্থায়ন সম্পন্ন হয়েছে। বাকি প্রস্তাবগুলোর সংশোধন ও পুনর্মূল্যায়নের কাজ প্রক্রিয়াধীন। 

আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ তিন কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২৫০টি প্রস্তাব জমা পড়ে, যার মধ্যে ১৯২টির অর্থায়ন হয়। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা, গবেষণা প্রকল্প ছিল ১২৮টি। ২০২২-২৩-এ বরাদ্দ দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা, প্রকল্প ১৬৫টি। 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে যে বাজেট দেওয়া হয়, তা অনেক কম। আমরা আগামী অর্থবছর থেকে বাজেট দ্বিগুণ করার জন্য কাজ করছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে আমরা সফল হবো।’

বাজেট বরাদ্দে অপর্যাপ্ততা
বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট গবেষণা বাজেট বাড়লেও তা শিক্ষকদের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাত শতাধিক শিক্ষকের জন্য বরাদ্দ মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা, যা শিক্ষকপ্রতি গড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যেই গবেষণা উপকরণ, ফিল্ডওয়ার্কসহ অন্যান্য খরচ মেটাতে হয়। গবেষণায় উৎসাহী করতে বিভিন্ন কনফারেন্স, সেমিনার ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। এসবের রেজিস্ট্রেশন ফি নিজস্ব অর্থায়নে করতে হয়। 

এ ছাড়াও নিজস্ব রিসোর্স ছাড়া বাইরে গবেষণা করতে গেলে বাধার সম্মুখীন হন গবেষকরা। ফলে অনেক শিক্ষক গবেষণায় আগ্রহ হারান। বিজ্ঞান অনুষদের ল্যাব সুবিধা, যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আধুনিক ক্লাউড সিস্টেম, ডেটাবেজ কিনতে হয়। ফলে প্রয়োজন হয় আর্থিক সুবিধার, যা গবেষণায় প্রাপ্ত বাজেটে সম্ভব হয় না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু লায়েক বলেন, ভালো মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশে ফি লাগে, যা গবেষকের সামর্থ্যের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এই ফি বহনের ব্যবস্থা করতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন চুক্তিতে প্রকল্প নিতে পারে। এতে শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে।
এ প্রসঙ্গে গবেষণা সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক বলেন, ‘প্রতিবছর গবেষণা প্রস্তাবে বরাদ্দ ৫ শতাংশ বাড়ার কথা থাকলেও আমরা ১০ শতাংশ করতে চেয়েছি। এ বছর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এটা পর্যাপ্ত নয়। যে বাজেট আসে সেটা পুরোপুরি ব্যয় হয়ে যায়।’

গবেষণাবিমুখ শিক্ষকরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল কাজ পাঠদান ও গবেষণা। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষক অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম পাঠদান কিংবা কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। ফলে গবেষণায় আগ্রহ নেই তাদের। এর আগে জমা পড়া গবেষণা প্রস্তাবের বেশির ভাগই বাদ পড়ত। তবে এ বছর শিক্ষকদের আগ্রহ বাড়াতে জমা পড়া ২১৬টি গবেষণা প্রস্তাবের ২১১টি নির্বাচন করা হয়েছে।

গবেষণায় শিক্ষার্থী সহকারী ও নতুন শর্তারোপ
আগামী ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের গবেষণা প্রস্তাবে চারটি শর্ত মানতে হবে। পেপার সাবমিট করা হয়েছে, পেপার রিভিউ স্টেজে আছে, পেপার অলরেডি অ্যাকসেপ্ট এবং পাবলিশড হয়ে গেছে। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কমপক্ষে একজন গবেষণা সহকারী রাখতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়। ফলে গবেষণার মান বাড়ছে না। সেই সঙ্গে এ বাজেটে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা সম্ভব নয়।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, গবেষণার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা আসলেই অপর্যাপ্ত। বার্ষিক বাজেট বৃদ্ধি ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং গবেষণার মান উন্নত করতে কর্তৃপক্ষ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

আরও পড়ুন

×