চেতনার সৈকতে সুরের অর্ঘ্য
মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিল্পীদের পরিবেশনা সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল পঞ্জিকার পাতায় আটকে থাকা কোনো দিন নয়। এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রথম উন্মেষ। ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত পথ ধরেই রোপিত হয় একটি ‘অসাম্প্রদায়িক’ বাংলাদেশের বীজ, যার মহিরুহ রূপ আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে ঢাকার নানামুখী আয়োজনে এবারও প্রতিধ্বনিত হলো শিকড়ের প্রতি সেই
অকৃত্রিম টান।
দিনব্যাপী আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের আয়োজন, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মানুসন্ধানের এক অনন্য মঞ্চ।
গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের মিলনায়তনে একুশ ধরা দিয়েছিল এক ভিন্ন দার্শনিক আঙিনায়। গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে ছায়ানট একুশকে উদযাপন করেছে ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও জাতিসত্তার শিকড় খোঁজার তাগিদে।
সম্মেলক কণ্ঠে নাজিম মাহমুদের কালজয়ী রচনা ‘আমাদের চেতনার সৈকতে’ গানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পুরো আয়োজনের মূল সুরটি বেঁধে দেন ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বায়ান্ন থেকে একাত্তরের অবিচ্ছেদ্য সংযোগ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একুশকে আড়াল করলে ৭১ আড়াল হয়ে যায়। আর ৭১-কে আড়াল করলে বাঙালি জাতিসত্তা টিকে না। সে কারণেই একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে পরম সত্য।
জাতীয়তাবাদ যে সবসময়ই ভাষাকেন্দ্রিক, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ভাষা সবসময় ধর্মীয় পরিচয়কে উপেক্ষা করে, সব ধর্মের মানুষকে একত্র করে। তাঁর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আজ আমরা যে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক, তার জন্মকথার রচয়িতাই হলেন ভাষাসংগ্রামের শহীদেরা। ৫২-এর সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বুকে ধারণ করেই ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ছায়ানট।
কথামালার এ গভীর উপলব্ধির পর শুরু হয় সুর ও বাণীর অর্ঘ্য। শিল্পীদের কণ্ঠে যেন মূর্ত হয়ে ওঠে বাঙালির গৌরব আর দ্রোহের ইতিহাস। সুস্মিতা দেবনাথ শুচির কণ্ঠে অতুলপ্রসাদ সেনের ‘মোদের গরব মোদের আশা’, ইফ্ফাত বিনতে নাজিরের গাওয়া রবীন্দ্রনাথের ‘নিশিদিন ভরসা রাখিস’ কিংবা ধ্রুব সরকারের গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ উপস্থিত দর্শকদের আবেগে আপ্লুত করে।
একে একে প্রিয়ন্তু দেব, ঐশ্বর্য সমাদ্দার, মোহিত খান, নুসরাত জাহান রুনা, অর্ণব বড়ুয়া, ফারজানা আফরিন ইভা এবং সুমন মজুমদার তাদের সুমধুর কণ্ঠে তুলে ধরেন দেশপ্রেম ও ভাষার গান। পাশাপাশি ছিল আবৃত্তির মূর্ছনা। ডালিয়া আহমেদ সৃজন সেনের ‘মাতৃভূমির জন্য’ এবং দেওয়ান সাঈদুল হাসান অসীম সাহার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতা দিয়ে মুগ্ধতা ছড়ান।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কালজয়ী ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি সম্মেলক কণ্ঠে গীত হয়। সবশেষে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ছায়ানটের শিকড়সন্ধানী আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
ছায়ানটের পাশাপাশি রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দিনটিকে পালন করেছে নিজ নিজ স্বকীয়তায়।
বাংলা একাডেমি: মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা
একুশের প্রথম প্রহর রাত সাড়ে ১২টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের নেতৃত্বে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলা একাডেমির কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল ৮টায় নজরুল মঞ্চে বসে শতাধিক কবির অংশগ্রহণে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর, যাতে সভাপতিত্ব করেন কবি আবদুল হাই শিকদার।
সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় ‘অমর একুশে বক্তৃতা ২০২৬’। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্ ‘একটি স্কুল-মাসিক ম্যাগাজিন ছাত্র-সুহৃদের ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন। অনুষ্ঠানে একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক একুশের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে বলেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কেবল অতীতের বিষয়ই নয়, এটি বহমান বর্তমানকে ধারণ করে আলোকিত আগামীর দিকে নিয়ে চলে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে আক্ষরিক অর্থেই বৈশ্বিক রূপ দেয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বিকেল সাড়ে ৩টায় জাদুঘরের উন্মুক্ত চত্বরে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষার নাগরিকেরা নিজ নিজ ভাষার কবিতা পাঠ করেন, যার বাংলা অনুবাদ ও কবিতা আবৃত্তি করেন দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরা।
অন্যদিকে, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকায় চলছে ‘সংকলন’ শীর্ষক এক বিশেষ প্রদর্শনী। গত সাত দশক ধরে সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও স্মৃতি গঠনে যে ভূমিকা রেখেছে, তা এই প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই উন্মুক্ত প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
উদীচী, কচি-কাঁচার মেলা ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য
সকাল সাড়ে ৬টায় নীলক্ষেত থেকে প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সকাল সাড়ে ৯টায় শিশু একাডেমির সামনে গান ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর সংগঠন কচি-কাঁচার মেলা আয়োজন করে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে কেন্দ্রীয় মেলার সভাপতি খোন্দকার মো. আসাদুজ্জামানসহ অন্যান্যের সঙ্গে বক্তব্য দেন শিশুবক্তা শেখ মাশিয়াত আয়শা।
বিকেল সাড়ে ৩টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুক্তমঞ্চে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আহ্বায়ক জামসেদ আনোয়ার তপন। আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন ডাকসুর সদস্য হেমা চাকমা। এর আগে ভোর ৭টায় পলাশী মোড় থেকে প্রভাতফেরি করে সংগঠনটি।
- বিষয় :
- মাতৃভাষা
