ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মশায় দিশেহারা নগরবাসী

মশায় দিশেহারা নগরবাসী
×

 অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘মশার যন্ত্রণায় পুরা দিনডা বইসাই থাওন লাগে। সৈন্দ্যা হইলে মশা হাত-পায় জরায় যায়। মনে অয় আমারেই অক্ষণই তুইল্লা নিয়া যায়।’

এমন অভিজ্ঞতার কথা জানালেন রাজধানীর তেজকুনিপাড়ার চা বিক্রেতা আরিফুল ইসলাম। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মশার যন্ত্রণায় কখনও স্বস্তিতে বেচাবিক্রি করতে পারি না। টং দোকানের দুপাশে সারাক্ষণ দুটি কয়েল জ্বালিয়ে রাখি। তারপরও মশা কমে না।’ 

কেবল তেজকুনিপাড়া নয়, এই অবস্থা রাজধানীজুড়ে। বাধ্য হয়ে সম্প্রতি এক আইনজীবী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। কয়েক মাস ধরে মশার এই দৌরাত্ম্য চললেও দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ ছিল না। সরকার বদলের পর সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশন একটু তৎপর হয়েছে। আর গত দেড় বছরে মাঝেমধ্যে ওষুধ ছিটালেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। 

কেন এত মশা, তা নিয়ে মশক বিশেষজ্ঞরা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকেই দুষছেন। মশক বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সমকালকে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে বৃষ্টি নেই। তাতে ড্রেন, বক্স-কালভার্ট ও জলাধারগুলোতে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব জায়গায় পানি আটকে আছে, তা পচে গেছে। আবার শীত চলে যাওয়ায় তাপমাত্রাও বেড়েছে। এগুলো মশার বংশবিস্তারের জন্য একেবারই অনুকূল পরিবেশ। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনও সঠিকভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। তারা সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করলে এত অবনতি হতো না।

অবশ্য কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী। তিনি বলেন, বিগত বছরের তুলনায় এবার মশার উপদ্রব কম। ডিএনসিসি সারাবছরই মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ জন্য এবার মশা কম। 

তবে রাজধানীর রোকেয়া সরণির পীরেরবাগ রোডের বাসিন্দা আশরাফ হোসেন বলেন, ‘মশা নিয়ে খুব বিপদে আছি। এত মশা জীবনে দেখিনি। বাসার আশপাশে মশা নিয়ন্ত্রণের সামগ্রীরও সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মশার কয়েল পাওয়া গেলেও মশা তাড়ানোর বৈদ্যুতিক তরল-বাষ্পীয় যন্ত্র পাওয়া যাচ্ছে না।’

প্রায় একই অভিযোগ করেন বংশালের বাসিন্দা মোহাম্মদ পারভেজ। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে ফগারম্যানরা আসে। কোনো রকম স্প্রে করেই চলে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে আর দেখা পাওয়া যায় না। 

মশা কেন বেড়েছে
বিগত বছরগুলোতে পাড়া-মহল্লার মশক নিধন কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করতেন কাউন্সিলররা। 

মশককর্মীদের মধ্যে ওষুধ বিতরণ, কোথায় কোথায় বেশি করে ওষুধ ছিটাতে হবে– এলাকাবাসীর কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে সেটি করা হতো। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ অভিযান, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, মাইকিং, এডিস মশা ও লার্ভা পাওয়া ভবনগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হতো।

মশার উপদ্রব বেড়ে গেলেই চালানো হতো ক্রাশ প্রোগ্রাম। অভ্যুত্থানের পর মেয়র-কাউন্সিলরদের বরখাস্তের কারণে প্রশাসকরা দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। মশককর্মীদের কার্যক্রম মনিটর না করায় তারাও কাজে ফাঁকি দিয়েছে বিস্তর। এমনকি মশককর্মীদের যে বডি ক্যামেরা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও তারা ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। কাউন্সিলরদের দায়িত্ব আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার (আনিক) ওপর বর্তালেও দাপ্তরিক অন্যান্য কাজের কারণে মশককর্মীদের দেখভালের সুযোগ পাননি তারা। 

মূলত লম্বা সময় ধরে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম চলেছে একেবারেই ঢিমেতালে। যারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, একজন ছাড়া কেউ তিন মাসের বেশি থাকতে পারেননি। একেকজন প্রশাসকের কাজ বুঝে ওঠার আগেই বদলি হয়ে যেতে হয়েছে। এ সময়ে জলাশয়গুলোর কচুরিপানা পরিষ্কার, ড্রেন পরিষ্কার, খালের বর্জ্য অপসারণ, জলাধারগুলোতে নোভালরুন ট্যাবলেট ছিটানোর মতো কাজগুলো করা হয়নি। 

তার ওপর বর্জ্য অপসারণ কাজ ঠিকমতো না হওয়ায় মশার বংশবিস্তারের যত রকম অনুকূল পরিবেশ দরকার, তার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে। এ অবস্থার এখনও তেমন পরিবর্তন হয়নি। 

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নতুন করে দুই সিটিতে প্রশাসক নিয়োগের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম এ ব্যাপারে তৎপর হন। ১০ দিনব্যাপী একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেন। তাতেও খুব একটা কাজ হয়নি। 

কিছু এলাকা নিয়ে বিপত্তি
ডিএনসিসির আওতাধীন কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে তারা মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে পারেন না। ওই এলাকার কর্তৃপক্ষগুলোও যথাযথভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করে না বলে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলে থাকেন। অথচ এলাকাগুলো ডিএনসিসির গায়ে গায়ে জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– মিরপুর ডিওএইচএস, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, মহাখালী ডিওএইচএস, বারিধারা ডিওএইচএস, বনানী ডিওএইচএস, সিভিল অ্যাভিয়েশনের অধীন এলাকা এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলেন, এসব এলাকা থেকে মশা অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। 

তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। 

মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে বরাবরই মশা প্রকট। এবার মাত্রা ছাড়িয়েছে। সন্ধ্যায় বাসার বাইরে গেলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা আক্রমণ করে।’

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ডিএনসিসির মশককর্মীদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। এ ছাড়া সিভিল অ্যাভিয়েশনের আওতাধীন কিছু জলাশয় রয়েছে, সেখানেও মশা প্রকট। সম্প্রতি সরকারের অনুমতি নিয়ে কেবল শাহজালাল বিমানবন্দরের চারপাশে ডিএনসিসিকে মশার ওষুধ ছিটানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মশার দৌরাত্ম্য সম্পর্কে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘আমাদের ওষুধের কোনো ঘাটতি নেই। অন্যান্য কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তবে মশা যাতে আর বাড়তে না পারে, সে লক্ষ্যে ক্রাশ প্রোগ্রাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করাসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই মশা আরও কমে যাবে।’

 

আরও পড়ুন

×