সাক্ষাৎকার
সরকারের পদক্ষেপে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রশ্নে শূন্যতা সৃষ্টি হবে
মো. মাসদার হোসেন
মো. মাসদার হোসেন
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মো. মাসদার হোসেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণ-সংক্রান্ত মামলার বাদী। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জারি করা অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে রহিতকরণসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সমকালের পক্ষে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওয়াকিল আহমেদ হিরন
সমকাল: বিচারক বিভাগ সংস্কার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো সংসদীয় কমিটির সুপারিশে রহিত করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এতে বিচারক নিয়োগসহ বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব আগের মতো থেকে যাচ্ছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মাসদার হোসেন: শুধু বিচার বিভাগ নয়, স্থানীয় সরকারসহ অন্যান্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশগুলো জারি করেছে, সেগুলো বর্তমান সরকারের পর্যালোচনা করা উচিত। যদি সরকার মনে করে কোথাও আইনগত ব্যত্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে তারা পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন–অধ্যাদেশ অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে ২৫ জন বিচারক নিয়োগ হয়েছে এবং তারা বর্তমানে বিচারকাজ করছেন। সংস্কারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও নানা অগ্রগতি ছিল। সেগুলো থমকে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটা দেশের জন্য, এমনকি বর্তমান সরকারের জন্য ভালো নয়।
সমকাল : এখন উচ্চ আদালতে কীভাবে বিচারক নিয়োগ হবে?
মাসদার হোসেন: গত ৫৪ বছর ধরে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের কোনো আইন ছিল না। যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা তাদের পছন্দের লোকজনকে নিয়োগ দিয়েছে। অনেক দেশে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশেও নিম্ন আদালতে একজন সহকারী জজ হতে হলে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিতে হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগে এই ব্যবস্থা নেই।
সমকাল: তাহলে উচ্চ আলাদতে যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধা কীভাবে যাচাই হবে?
মাসদার হোসেন: ৫৪ বছর দলীয় ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ হয়েছে। নতুন সরকার এসে আগের সরকারের নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেককে স্থায়ী করেনি। এই যে অনাচার– এগুলো মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করছে। আবার যাদের রাখা হয়, তাদের গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চ না দিয়ে কোণঠাসা করে রাখা হয়। বিচারপ্রার্থীরাও এসব বোঝেন। এ জন্য আমরা চেয়েছি, রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাকে পাশে রেখে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিচারক নিয়োগ হোক। অধ্যাদেশে যদি ভুলত্রুটি থাকে, সংশোধন করার ক্ষমতা তো এই সংসদের আছে।
সমকাল : বিচারব্যবস্থায় এর কী প্রভাব পড়বে?
মাসদার হোসেন: বিচারক নিয়োগ এবং মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে জারি করা অধ্যাদেশ যদি এখন ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রশ্নে শূন্যতা সৃষ্টি হবে।
সমকাল: সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল কর্মকর্তাদের কী হবে?
মাসদার হোসেন: সচিব, যুগ্ম সচিবসহ অনেক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় নিয়ে জারি করা দুটি অধ্যাদেশ মৃত হয়ে গেল। উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা যাবে আগের মতো সরকারের হাতে। আগে যা ছিল, এখন তাই হবে। যেসব জুডিশিয়াল কর্মকর্তাকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের আরেকটি প্রজ্ঞাপন করে অন্যত্র সরাতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার শুধু অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির জন্য বিধিমালা করেছিল, কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন করেনি।
সমকাল: বিচার বিভাগ আলাদা করতে রায়ে কী বলা হয়েছে?
মাসদার হোসেন: মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ১২ দফায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখতে হবে বিচার বিভাগকে। রায়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে, কেমন হবে বিচার বিভাগ। সেটা তৈরি করা হয়েছিল। এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই রায়ের ওপর হাত দেওয়া হলো।
সমকাল: এ অবস্থায় আপনার প্রত্যাশা কী?
মাসদার হোসেন: এখন আমরা সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি বিচার বিভাগ চাই। বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি– সবই সুপ্রিম কোর্ট করবে। অতীতের ইতিহাসের সাক্ষী আমি। কোনো মামলায় বিচারক ১০টায় জামিন দিয়েছেন, ১২টায় তাঁর বদলির আদেশ হয়েছে। বিচারক থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ সারাদেশে আমি এটা দেখেছি। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে বিচার করবে, এখানে কেউ ধমক দেবে না, নিয়ন্ত্রণ করবে না– এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যদি কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হয়, তাহলে জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
আপনারা জানেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়টা এখনও সুপ্রিম কোর্টের হাতে। সারাদেশে ৪৭ লাখ মামলার ভারে বিচারকরা ন্যুব্জ হয়ে আছেন। কর্মপরিবেশ নেই, অনেক অনিয়ম। আমি সরকারের কাছে বিনীতভাবে আবেদন রাখতে চাই, অপ্রয়োজনীয় আইন বাদ দিয়ে জনবান্ধব এবং সহজে এবং স্বল্পতম সময়ে বিচার পাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। বিচার বিভাগের কল্যাণের জন্য আইনজীবী, বিচারক ও বিজ্ঞজনদের নিয়ে হাইপাওয়ার একটি কমিটি করা হোক। এটা ছয় মাস বা এক বছরের জন্য হতে পারে। তারা বিচারালয়ে জনগণের কষ্ট লাঘবের জন্য কাজ করবে।
সমকাল: সরকার কী কারণে এমন পদক্ষেপ নিল বলে আপনি মনে করছেন?
মাসদার হোসেন: ধরে নিলাম, বিচার বিভাগ সচিবালয় অধ্যাদেশ যথাযথ হয়নি। কারণ পিসমিল করে অর্ধেক দায়িত্ব দেওয়া হলো সরকারের অধীনে আর অর্ধেক দেওয়া হলো বিচার বিভাগের সচিবালয়ের অধীনে। খণ্ডিত হলো কেন? দুনিয়ার অন্যান্য দেশের বিচার বিভাগ দেখেন। তাদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি কারা করছে?
আমাদের দেশের সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে বিচার বিভাগে গবেষণা টিম নেই। সব দেশে এটা আছে। নেপালে তারা পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। তারা বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও বিচারককে নিয়ে গবেষণা করে। এরপর আলোচনা করে সংস্কার কার্যকর করে। তাদের বিচার বিভাগ জনসম্পৃক্ত। সংবিধান বলছে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে না– এমন আইন বা বিধান সংবিধানের ১০২ ধারার অধীনে অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন হাইকোর্ট। সেই ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়েছে।
সমকাল: উচ্চ আদালতের কি এগিয়ে আসার সুযোগ আছে?
মাসদার হোসেন: হ্যাঁ! সংসদে আইন পাস করেছেন তো কী হয়েছে। যদি দেখা যায়, আইনটি জনবান্ধব নয়, তাহলে সংসদের পাস করা আইনকে অবৈধ ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টকে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় আপনারা দেখেননি? তারাই যদি সব বুঝে থাকে, আমরাই সব করব বিচার বিভাগ কিছু নয়, এটা সঠিক হবে না। জনকল্যাণের স্বার্থে আপনাকে এটা নিতে হবে। আগে মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নের জন্য কোনো কোনো সরকার সাতবার, দশবার সময় নিয়েছে। একটা মামলার রায় বাস্তবায়ন করতে যদি তিন যুগ সময় লেগে যায়, তাহলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের অবস্থা কী হবে! আমি জেলা জজ থাকাকালে একটা মামলা সহকারী জজকে দিয়ে ডিসপোজাল করিয়েছি। তিনি এখন হাইকোর্টের বিচারপতি। কিন্তু ওই মামলা এখন পর্যন্ত হাইকোর্টে বিচারাধীন। এখানে কি কেউ দৃষ্টি দেওয়ার নেই? জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বলতে আমাদের দেশে কিছুই করা হবে না? এই জন্য এমন একটা বিচার বিভাগ দরকার, যে জনবান্ধব হবে।
সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।
মাসদার হোসেন: সমকালের পাঠকদেরও ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
- বিচার বিভাগ
- সুপ্রিম কোর্ট
