ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৬৩% প্যাকেটজাত খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, লেবেলিং না থাকায় ঝুঁকিতে ভোক্তা

৬৩% প্যাকেটজাত খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, লেবেলিং না থাকায় ঝুঁকিতে ভোক্তা
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৪৭

দেশে প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার এসব খাবার খান। অথচ বাজারে থাকা পণ্যের ৬৩ শতাংশেই রয়েছে অতিরিক্ত লবণ (সোডিয়াম), যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিপস, চানাচুর, নুডলস, বিস্কুট ও চকলেটসহ নানা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি অনেক পণ্যের মোড়কে এসব উপাদানের তথ্যই উল্লেখ করা হয় না—ফলে ভোক্তারা অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ খাবার গ্রহণ করছেন।

রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল): প্রয়োজনীয়তা, অগ্রগতি ও করণীয়’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সাংবাদিক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজন করে এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) সহযোগিতা দেয় এই কর্মশালায়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে—প্রতি ১০০ গ্রাম লজেন্সে চিনি রয়েছে ৪৩ গ্রাম, যেখানে নির্ধারিত সীমা ২৫ গ্রাম। একইভাবে, ১০০ গ্রাম ডাল ভাজায় লবণ পাওয়া গেছে ৬.১ গ্রাম, যা সর্বোচ্চ সীমা ৫ গ্রাম ছাড়িয়েছে। বিস্কুট ও মিল্ক চকলেটে ট্রান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উপস্থিতিও উদ্বেগজনক।

সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে পুষ্টিগত তথ্যের ঘাটতিতে। প্রায় ৪৬ শতাংশ পণ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ৩৮ শতাংশে ট্রান্স ফ্যাট এবং ২১ শতাংশে চিনি ও লবণের তথ্য নেই। কোনো প্যাকেটেই উপাদানগুলোর স্পষ্ট ও বোধগম্য পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশেও অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক—প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদ্‌রোগে মারা যান। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই এসব অসংক্রামক রোগে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস।

এই প্রেক্ষাপটে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্যাকেটের সামনে ‘উচ্চ’ বা ‘অতিরিক্ত’ সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তারা সহজেই খাদ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ‘বেস্ট বাই’ উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বাংলাদেশেও এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে। তবে খাদ্যশিল্পের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সরকার এফওপিএল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম বলেন, অসংক্রামক রোগ কমাতে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি। এফওপিএল ভোক্তাকে স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে সহায়তা করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার সামিনা ইসরাত বলেন, এফওপিএল প্রবর্তন দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ বলেন, এফওপিএল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ বজায় রাখা প্রয়োজন।

জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, এফওপিএল চালু হলে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমবে এবং স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাস পাবে।

কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মা) কনভেনর মর্তুজা হায়দার লিটন, কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ ও মিজান চৌধুরী এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা দেন হাসান শাহরিয়ার ও শবনম মোস্তফা।
 

আরও পড়ুন

×