ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

এআইনির্ভর অর্থনীতি গড়তে শুধু বাজেট নয়, চাই শক্ত ভিত্তি

এআইনির্ভর অর্থনীতি গড়তে শুধু বাজেট নয়, চাই শক্ত ভিত্তি
×

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

সালমা নাবিলা সুলতানা

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ২৩:০৪ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ | ২৩:১০

বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের পথে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশও সেই দৌড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শামিল হয়েছে। ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ, নাগরিক সেবায় এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং আইসিটি খাতের জিডিপিতে অবদান বাড়ানোর লক্ষ্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এআই-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে ওঠে শুধু অর্থ বরাদ্দে নয়; তার জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। আমাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভিত্তি কতটা দৃঢ়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। 

বর্তমানে এআই বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সিঙ্গাপুর ও এস্তোনিয়ার মতো দেশগুলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সরকারি সেবার আধুনিকীকরণ এবং নতুন শিল্প গড়ে তুলতে এআইকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এ খাতে সফলতা বাজেটের অঙ্কের চেয়ে বেশি নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, গবেষণা বিনিয়োগ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর।

আর সেখানেই আমাদের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে। তা হলো- বাজেটে বরাদ্দের ঘোষণা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই বরাদ্দ কীভাবে একটি এআইভিত্তিক অর্থনীতির টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলবে, তার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো স্পষ্ট নয়। এই তহবিলের আওতায় কতজন এআই প্রকৌশলী তৈরি হবে, কতটি বিশ্বমানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হবে, কতটি দেশীয় প্রযুক্তি স্টার্টআপ এই তহবিল থেকে প্রত্যক্ষ সহায়তা পাবে কিংবা পাঁচ বছর পর এই বিনিয়োগের সাফল্য কোন কোন সূচকে মূল্যায়ন করা হবে- এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য নেই। অর্থনীতিতে যে কোনো বিনিয়োগের সাফল্য কেবল বরাদ্দের অংকে নয়, বরং পরিমাপযোগ্য ফলাফলে নির্ধারিত হয়। সেই বিবেচনায় এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অর্থের পরিমাণ নয়, বরং ফলাফল পরিমাপের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অনুপস্থিতি।

আমাদের রপ্তানি খাতের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের আইসিটি সেবা রপ্তানি ৭২৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এটি একসময়ের ঘোষিত উচ্চাভিলাষী রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠে- নতুন এআই বিনিয়োগ কি সেই পুরোনো সীমাবদ্ধতা ভাঙতে পারবে, নাকি আবারও ঘোষণার উচ্চতা বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতায় আটকে যাবে? যদি বরাদ্দের সঙ্গে মৌলিক গবেষণা, দেশীয় উদ্ভাবন, রপ্তানিযোগ্য প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সমন্বিত কৌশল না থাকে, তবে এই বিশাল বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে পারবে না।

অন্যদিকে দক্ষ মানবসম্পদের ক্ষেত্রেও দেশে একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অন্যদিকে দেশীয় প্রযুক্তি খাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলী, এআই বিশেষজ্ঞ ও সাইবার নিরাপত্তা পেশাজীবীর তীব্র ঘাটতির কথা বলে আসছে। অর্থাৎ সমস্যা কর্মসংস্থানের সুযোগের নয়, বরং প্রকৃত দক্ষতার। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে যে ধরনের মানবসম্পদ তৈরি করছে, প্রযুক্তি ও শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদা তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এআই-তে বড় বিনিয়োগের আগে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কি এআইনির্ভর অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় ও দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারছি, নাকি কেবল প্রযুক্তির রঙিন স্বপ্নই দেখছি?

এআইনির্ভর অর্থনীতির আরেকটি মৌলিক ও অপরিহার্য শর্ত হলো শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো। এলএলএম, ক্লাউড কম্পিউটিং কিংবা ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য কেবল সফটওয়্যার দক্ষতাই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উচ্চগতির ইন্টারনেট, উন্নত সাইবার নিরাপত্তা এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং সুবিধা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ‘এনার্জি অ্যান্ড এআই’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের ফলে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। অর্থাৎ এআই-তে বিনিয়োগের অর্থ শুধু সফটওয়্যারে বিনিয়োগ নয়; এর সাথে জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামোতেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে তথ্য সুরক্ষা ও নৈতিক ব্যবহারের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না। নাগরিক সেবায় এআই ব্যবহারের আগে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার কার্যকর আইন ও নির্ভরযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে এআই ও তথ্য সুরক্ষায় সুস্পষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশকেও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পাশাপাশি নাগরিকের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে ৫০০ কোটি টাকার এই বরাদ্দ একটি ইতিবাচক সূচনা। কিন্তু এআইনির্ভর অর্থনীতি কেবল অর্থ বরাদ্দ দিয়ে গড়ে ওঠে না; এটি গড়ে ওঠে গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী অবকাঠামো, তথ্য সুরক্ষা, জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই এআইকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তি করতে চায়, তাহলে এখন প্রয়োজন তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া- পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ, শিক্ষা-গবেষণা-শিল্পখাতের কার্যকর সমন্বয় এবং তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার শক্তিশালী আইনি কাঠামো। কারণ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি দেশের সামগ্রিক প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে।

সালমা নাবিলা সুলতানা, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×