পাঁচ মিনিটের নাচেই মিলতে পারে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি
মাত্র পাঁচ মিনিট নাচ মনোযোগ উন্নতি ঘটাতে পারে। ছবি: গেটি ইমেজেস
বিবিসি
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৭ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ১৩:২১
কাজের চাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা বসে থাকা এখন অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। এর প্রভাব পড়ে শরীরের পাশাপাশি মন ও মস্তিষ্কেও। তবে গবেষণা বলছে, দিনের মাঝে মাত্র পাঁচ মিনিটের নাচের বিরতিই বদলে দিতে পারে এই চিত্র। মনোযোগ বাড়ানো, মেজাজ ভালো রাখা, স্মৃতিশক্তি ও সৃজনশীলতা উন্নত করা থেকে শুরু করে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ক্ষতি কমাতেও কার্যকর হতে পারে এই ছোট্ট অভ্যাস।
কেন উপকারী পাঁচ মিনিটের নাচ
নাচকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষকদের মতে, এটি এমন একটি শারীরিক কার্যকলাপ যেখানে ব্যায়াম, সঙ্গীত এবং মানসিক সম্পৃক্ততা একসঙ্গে কাজ করে। ফলে শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কও সক্রিয় থাকে। নিয়মিত মাত্র পাঁচ মিনিট নাচলেও এর ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করা সম্ভব।
এক গবেষণার অংশ হিসেবে এক সাংবাদিক টানা এক সপ্তাহ প্রতিদিন কাজের মাঝখানে পাঁচ মিনিট নাচের অভ্যাস করেন। প্রথম দিন কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নিজেকে আরও প্রাণবন্ত, সতেজ ও কর্মক্ষম বলে অনুভব করেন। বিশেষ করে দুপুরের ক্লান্তি অনেকটাই কমে যায়।
শরীর ও মস্তিষ্কের যুগল ব্যায়াম
নাচ-মনোবিজ্ঞানী ও সাবেক পেশাদার নৃত্যশিল্পী পিটার লোভাট বলেন, মানুষ জন্মগতভাবেই ছন্দ ও নড়াচড়ার প্রতি সাড়া দিতে সক্ষম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নাচ থেকে দূরে সরে যাই, অথচ এটি আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিরই অংশ।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এম্পিরিক্যাল এস্থেটিক্স–এর স্নায়ুবিজ্ঞানী ও সাবেক ব্যালে নৃত্যশিল্পী জুলিয়া ক্রিস্টেনসেন বলেন, নাচ এমন একটি কার্যক্রম যেখানে অ্যারোবিক ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ এবং সৃজনশীল প্রকাশ-এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। অন্য কোনো একক ব্যায়ামে এমন সমন্বয় খুব কমই দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যদের সঙ্গে নাচলে শরীরে এন্ডোরফিনসহ ভালো অনুভূতি তৈরিতে সহায়ক বিভিন্ন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়
নাচের সময় শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কেরও একাধিক অংশ সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কোনো নাচের ধাপ বা রুটিন অনুসরণ করলে তা মনে রাখা, সঠিক ক্রমে করা এবং সঙ্গীতের সঙ্গে তাল মেলানোর কারণে মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় কার্যক্রম আরও সক্রিয় হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত নাচের চর্চা স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
মাত্র পাঁচ মিনিটেই বাড়তে পারে মনোযোগ
স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র পাঁচ মিনিটের দলবদ্ধ নাচের পর তাদের পরবর্তী গণিত ক্লাসে মনোযোগের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। একই সঙ্গে শিশুরা এই কার্যক্রমকে অন্যান্য ব্যায়ামের তুলনায় বেশি উপভোগ করেছে।
গ্রিসের অ্যারিস্টটল ইউনিভার্সিটি অব থেসালোনিকি– এর বায়োমেকানিক্স ল্যাবরেটরির সহকারী অধ্যাপক ভ্যাসিলিওস প্যানাউটসা কোপাউলোস বলেন, কাজের ফাঁকে অল্প সময়ের শারীরিক নড়াচড়া মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়। অন্যথায় শরীরে ধীরে ধীরে ক্লান্তি জমতে থাকে।
সৃজনশীলতাও বাড়ায় নাচ
গবেষকদের মতে, নাচ শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকেও উৎসাহিত করে। বিশেষ করে তাৎক্ষণিক বা স্বতঃস্ফূর্ত নাচ মস্তিষ্ককে প্রচলিত চিন্তার বাইরে নতুন ধারণা তৈরি করতে সহায়তা করে।
জুলিয়া ক্রিস্টেনসেন বলেন, নাচের মাধ্যমে মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ সক্রিয় হয়, যা জটিল সমস্যার নতুন সমাধান খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। ফলে কাজের গতি ও সৃজনশীলতাও বাড়তে পারে।
মানসিক সুস্থতায় কার্যকর
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নাচ বিষণ্নতা কমাতে, মানসিক চাপ হ্রাস করতে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়ক। অনেক ক্ষেত্রে এটি অন্যান্য ব্যায়ামের তুলনায়ও বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত নাচ আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, নিজের শরীর সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগও বৃদ্ধি করে।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ক্ষতি কমায়
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা ৩০ মিনিটের বেশি সময় বসে থাকলে ক্যানসার এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে মাঝেমধ্যে উঠে অল্প সময় হাঁটা, শরীরচর্চা বা নাচের মতো কার্যক্রম করলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া নাচ শরীরের ভারসাম্য উন্নত করে, পেশি শক্তিশালী করে এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এ কারণেই পারকিনসনস রোগীদের পুনর্বাসন ও থেরাপিতেও নাচ ব্যবহার করা হয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ মাস নিয়মিত নাচের ফলে শরীরের ভারসাম্যের পাশাপাশি স্মৃতিশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশেরও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শুরুতেই কঠিন কোনো নাচ শেখার প্রয়োজন নেই। নিজের পছন্দের একটি গান চালিয়ে পাঁচ মিনিট নাচলেই যথেষ্ট। চাইলে অনলাইনে সহজ কোনো ড্যান্স রুটিন অনুসরণ করা যেতে পারে। পরে আগ্রহ বাড়লে গ্রুপ ড্যান্স বা ড্যান্স ফিটনেস ক্লাসেও অংশ নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিটের এই ছোট্ট অভ্যাসই শরীর ও মনকে আরও সতেজ, কর্মক্ষম এবং ইতিবাচক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
- বিষয় :
- নাচ
- স্বাস্থ্য
- বিশেষজ্ঞ মত