সহজিয়া
নারীকে বিচার নয়, তাঁর জীবনকে বুঝতে হবে
আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের ইতিহাসে যদি এমন একটি নীরব বিপ্লবের কথা বলতে হয়, যার প্রভাব অর্থনীতি, পরিবার, সংস্কৃতি, সমাজ– সবকিছুকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে, সেটি হলো নারীর ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ানো। এই বিপ্লব বন্দুকের শব্দে ঘটেনি; রাজনীতির মঞ্চেও নয়। এটি ঘটেছে ভোরের অন্ধকারে রান্না শেষ করে কাজে বেরিয়ে পড়া পোশাক শ্রমিকের পদচারণায়; নার্সের সারারাত জেগে রোগীর সেবা করার মধ্যে; গ্রামীণ নারীর হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষেতে কাজ করা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। এটি ঘটেছে সেই শিক্ষিকার হাতে, যিনি নিজের সন্তানকে মানুষ করার পাশাপাশি শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন।
একসময় অধিকাংশ নারীকে কেবল সংসারের ভেতরের মানুষ হিসেবে কল্পনা করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা পাল্টেছে। শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে; পোশাকশিল্পের বিস্তার ঘটেছে; স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নয়ন খাতে নারীর কর্মসংস্থান বেড়েছে। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে নারীর শ্রম মিশে আছে।
এই পরিবর্তনকে কেবল অর্থনীতির ভাষায় ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এটি মানুষের মর্যাদার গল্প। নারী যখন নিজের উপার্জনে সন্তানের স্কুলের বেতন দেন; বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ কেনেন; সংসারের বাজার করেন কিংবা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, তখন তিনি শুধু অর্থ উপার্জন করেন না; নিজের অস্তিত্বকেও স্বীকৃতি দেন।
অনেকেই বলেন, ‘আগের দিনে সংসার ভাঙত না, এখন এত বিবাহবিচ্ছেদ কেন’? আগের প্রজন্মে অসংখ্য নারী এমন দাম্পত্যে থেকেছেন, যেখানে ভালোবাসা ছিল না, সম্মান ছিল না। ছিল সহিংসতা, বিশ্বাস ভঙ্গ। তাদের আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ছিল। তাই অনেক সম্পর্ক টিকে ছিল ভালো থাকার কারণে নয়, বরং অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না বলে। আজ পরিস্থিতি ভিন্ন।
আজকের বাংলাদেশে একজন নারী সবসময় নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য কাজ করেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংসারের প্রয়োজনে। বাসা ভাড়া, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য মিলিয়ে ঢাকায় অসংখ্য পরিবারে দুইজনের আয় ছাড়া টিকে থাকা কঠিন।
একজন পোশাক শ্রমিক হয়তো ভোর ৬টার আগেই ঘর ছাড়েন। তার আগে তিনি রান্না করে যান; সন্তানের খাবার গুছিয়ে দেন; বৃদ্ধ শাশুড়ির ওষুধ রেখে যান। সন্ধ্যায় ফিরে আবার রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তানের পড়া, সংসারের হিসাব। তাঁর কর্মঘণ্টা কখন শুরু হয়, কখন শেষ হয়, সেটি ঘড়ি দিয়ে মাপা যায় না।
একজন গৃহকর্মী অন্যের বাড়ি পরিষ্কার করেন; নিজের ঘরও তাঁকে সামলাতে হয়। একজন নার্স রাতভর হাসপাতালের রোগীদের দেখাশোনা করে সকালে বাড়ি ফিরে নিজের সন্তানের জ্বর নিয়ে চিন্তা করেন। একজন স্কুলশিক্ষিকা শত শত শিশুকে মানুষ করেন; বাড়ি ফিরে নিজের সন্তানকে একই যত্নে বড় করেন। তারা পরিবারকে ছেড়ে যাননি, বরং তাদের কাঁধেই পরিবার টিকে আছে।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর জীবনে নতুন মাত্রা দিয়েছে– পছন্দ করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা সবসময় সহজ নয়। অনেক নারী এখনও সব বাধা সত্ত্বেও সংসার বাঁচানোর চেষ্টা করেন। যখন একটি সম্পর্কে বারবার প্রতারণা, অবহেলা, সহিংসতা কিংবা অসম্মান ফিরে আসে, তখন কিছু নারী সিদ্ধান্ত নেন– তাদের এবং তাদের সন্তানদের জন্য অন্য একটি জীবনই নিরাপদ।
এখন বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে আমরা এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি, যেখানে উভয় মানুষই মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারেন? একটি পরিবার কেবল অর্থ দিয়ে টেকে না। আবার ভালোবাসা দিয়েও টেকে না। সামাজিক নিয়ম দিয়েও টেকে না। পরিবার টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান, সততা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং একে অপরের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির ওপর।
আজকের অনেক নারী নিখুঁত মানুষ খোঁজেন না। তারা এমন সঙ্গী খোঁজেন, যিনি কথা রাখবেন, সন্তান পালনের দায়িত্ব ভাগ করে নেবেন, বিপদের সময় পাশে দাঁড়াবেন এবং স্ত্রীকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে সম্মান করবেন। অনেক পুরুষও এমন সঙ্গী চান, যাঁর সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেওয়া যায়; যিনি সম্মান, সহযোগিতা ও আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
অসংখ্য মা বিবাহ বিচ্ছেদের পরও সন্তানদের মানুষ করে চলেছেন। তারা স্কুলের ফি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন; সংসারের বাজেট তৈরি করেন; সন্তানের মন ভাঙলে তাকে জড়িয়ে ধরেন। তাদের স্বাধীনতা দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়; বরং অনেক সময় একাই দায়িত্ব বহন করা। তবু তারা এগিয়ে চলেন। তাদের শক্তি শুধু নিজেদের নয়; পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নারীকে বিচার করা নয়; তাঁর জীবনকে বোঝা। কেন গৃহকর্মী প্রতিদিন অন্যের বাড়িতে আসেন? কেন পোশাক শ্রমিক নিজের সন্তানকে গ্রামে রেখে কাজ করতে বাধ্য হন? কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান? কেন একজন মা অসুস্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন? এসব প্রশ্নের উত্তর নৈতিক বিচার নয়; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতা দিয়ে খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করবে না। নির্ভর করবে পরস্পরকে কতটা সম্মান করতে শিখলেন, তার ওপর। আমরা কি এমন বাংলাদেশ গড়তে পারব, যেখানে একটি ছেলে ছোটবেলা থেকেই শিখবে, সংসারের দায়িত্ব শুধু তার মায়ের নয়? একটি মেয়ে জানবে, তার শিক্ষা, শ্রম, বিশ্বাস, কণ্ঠস্বর– সবকিছুরই মূল্য আছে? যেখানে বিবাহ কর্তৃত্বের সম্পর্ক নয়; অংশীদারিত্বের সম্পর্ক? যেখানে সন্তানরা শিখবে– নিয়ন্ত্রণ নয়, ভালোবাসা মানে পারস্পরিক সম্মান।
বাংলাদেশের নারীরা কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। তারা কেবল মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি চাইছেন। তারা পুরুষের স্থান দখল করতে চান না। তারা এমন একটি সমাজ চান, যেখানে নারী ও পুরুষ– উভয়েই সমমর্যাদায়, পরস্পরের সহযোগী হয়ে আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারেন।
সেই দিনই হয়তো আমরা সত্যিকারের উন্নত বাংলাদেশ গড়তে পারব। সে উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক বা অর্থনীতিতে নয়; মানুষের মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিফলিত হবে।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী
- বিষয় :
- আনুশেহ আনাদিল