জীবন দক্ষতা
নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশা পূরণ হবে কবে
মাহবুবুর রাজ্জাক
মাহবুবুর রাজ্জাক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষ সাধারণত দুর্ঘটনা-দুর্যোগ এড়িয়ে নিরাপদ জীবনযাপন করতে চায়। নিরাপদ জীবনযাপন হলো এমনভাবে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করা, যাতে নিজের ও অন্যের জীবন, স্বাস্থ্য, সম্পদ এবং পরিবেশের ক্ষতি কম হয়। এ জীবনযাপনের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার প্রয়োজন হয়। তা হলো, এমন জ্ঞান, দক্ষতা, আচরণ ও মূল্যবোধ অর্জন করা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঝুঁকি চিহ্নিত করে নিজেকে ও আশপাশের লোকজনকে নিরাপদ রাখতে পারে। এটি শুধু বিপদ এড়িয়ে চলার শিক্ষা নয়; বরং ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার সক্ষমতা তৈরির শিক্ষা।
দুর্ঘটনা যে কোনো সময় ঘটতে পারে। দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না। অথচ সঠিক সময়ে সচেতন হতে পারলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমানো যায়। একসময় গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি হতো। তখন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও এগিয়ে এসে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে সার্ভে করে অগ্নিনিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল। এর ফলে গার্মেন্টস খাতে অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
তবে বহু শিল্প খাতে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে অবহেলা এখনও ব্যাপক। তাই সামগ্রিকভাবে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি কমেছে বলা যায় না। বাসাবাড়ির রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা আর গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে আগুন লেগে প্রাণহানি ঘটছে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ-গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহারের বিধিমালা মেনে চললে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমে আসবে। তবে অভিজ্ঞতা বলে, যে কোনো অগ্নিকাণ্ডে সাধারণত মানুষ সরাসরি আগুনে পুড়ে নয়, ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে বেশি মারা যায়। তাই অগ্নিকাণ্ড ঘটলে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার আয়োজন বেশি জরুরি।
আগে মহাসড়কগুলোতে গাড়ির সামনাসামনি সংঘর্ষের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি হতো। আজকাল বিভাজক থাকায় মহাসড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষজাত দুর্ঘটনা কমে এসেছে। ফেরিতে ওঠানামার সময় ব্রেকফেল করলে গাড়ি সোজা নদীতে চলে যেতে পারে। যাত্রীদের উচিত এই সময় গাড়ি থেকে নেমে যাওয়া, তাহলে অন্তত প্রাণহানি এড়ানো যায়। ট্রাফিক আইন ও রাস্তা পারাপারের নিয়ম জানার পাশাপাশি পথচারী ও যানবাহন ব্যবহারকারীর দায়িত্ব সম্পর্কেও সকলের সচেতন হওয়া দরকার।
একসময় এই দেশে ডায়রিয়া আর কলেরার উপদ্রবে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটত। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। পানিতে আর্সেনিক দূষণের ঘটনা তো এই সেদিনের। পরিষ্কার ও নিরাপদ পানি ব্যবহার করে এবং আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করে মানুষ এসব মহামারি থেকে রেহাই পেয়েছে। নিয়মিত হাত ধোয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, খাবার ভালোভাবে রান্না ও সংরক্ষণ করা, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও মানসিক সুস্থতার চর্চা প্রভৃতি কারণে রোগবালাই অনেক কমে এসেছে। তবে ইচ্ছায় হোক-অনিচ্ছায় হোক খাদ্যে ভেজালের কারণে নতুন নতুন স্বাস্থ্যগত জটিলতাও সৃষ্টি হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিব্যবহার অনেক অসুখ-বিসুখের চিকিৎসাকে দুঃসাধ্য করে তুলেছে। মানুষ যদি ভেজাল খাদ্যের ব্যাপারে সচেতন হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ বন্ধ করে তবে স্বাস্থ্যগত সমস্যা এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে।
ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত ও জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনও বলে-কয়ে আসে না। বন আর জলাভূমি ধ্বংস করে মানুষের বসতির বিস্তারের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং এসব দুর্যোগ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে নগরায়ণ করা গেলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনার সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা কমবে। দুর্যোগকালীন আত্মরক্ষার জন্য করণীয়, প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তা নেওয়ার দক্ষতা, জরুরি আশ্রয় ও উদ্ধার পরিকল্পনার তথ্যাদি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আজকাল আমাদের শহরগুলোতে সামান্য বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কারণ, পানি সরে যাওয়ার খালগুলো আমরা বন্ধ করে ফেলেছি। রাস্তার ড্রেনগুলোও যত্রতত্র মানুষের ফেলে দেওয়া পলিথিনসহ নানা ধরনের আবর্জনার স্তূপে অকেজো হয়ে থাকে। ড্রেন ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় মানুষ সচেতন হলে জলাবদ্ধতা থাকার কথা নয়।
সচেতনতা, সতর্কতা ও প্রস্তুতি–নিরাপদ জীবনযাপনের তিনটি প্রধান ভিত্তি। নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য বাস্তব অনুশীলনভিত্তিক শিক্ষা বেশি কার্যকর হয়ে থাকে। তাই স্কুল অথবা মহল্লাভিত্তিক নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া যেতে পারে। যেমন– অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি বহির্গমন মহড়া, ভূমিকম্পের সময় করণীয় অনুশীলন, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বাস্তব অনুশীলন, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার মহড়া ইত্যাদি। উন্নত বিশ্বে এই জাতীয় মহড়া নিয়মিত হয়। নিরাপদ জীবনযাপনের শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন সচেতন, দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক তৈরি করা, যারা বিপদ ঘটার পর শুধু সাহায্যের অপেক্ষা করবে না; বরং বিপদ শনাক্ত করতে, ঝুঁকি কমাতে, নিজের জীবন রক্ষা করতে এবং প্রয়োজনে অন্যকে সহযোগিতা করতে সক্ষম হবে।
নিরাপদ জীবনযাপনের শিক্ষার সঠিক সময় হলো যতটা সম্ভব ছোট বয়স থেকে অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে সারাজীবন। তবে বয়স অনুযায়ী বিষয় ও শেখানোর পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। শিশুরা ছোট বয়সে দৈনন্দিন আচরণ ও অভ্যাস গড়ে তোলে। তাই নিরাপত্তার অভ্যাসও যদি ছোটবেলা থেকে তৈরি করা যায়, তা ভবিষ্যৎ জীবনে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে নিরাপদ জীবনযাপনের শিক্ষাকে কোনো একটি শ্রেণি বা নির্দিষ্ট বয়সের বিষয় হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। এটি প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে সকল স্তরে ধারাবাহিক সর্বজনীন জীবনদক্ষতা শিক্ষা হিসেবে চালু থাকা উচিত।
ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
- বিষয় :
- মাহবুবুর রাজ্জাক