ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কান্ডারিহীন হাওরের বিদ্যালয়

বিশেষ পদক্ষেপ জরুরি

বিশেষ পদক্ষেপ জরুরি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় কান্ডারি ছাড়াই চলিতেছে বলিয়া শুক্রবার প্রকাশিত সমকাল যে সংবাদ দিয়াছে, তাহা দুর্ভাগ্যজনক। সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলার তিন উপজেলা–অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের ২৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৪৯টিতে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নাই এবং সহকারী শিক্ষকেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ খালি। ফলস্বরূপ এই সকল প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ও একাডেমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করিয়াছে। অষ্টগ্রামের একজন শিক্ষার্থী সমকালের প্রতিবেদকের নিকট আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছে, সে প্রতিদিন ক্লাস করিতে আসিলেও একজন শিক্ষককে দুই-তিনটি ক্লাস লইতে হয়। সেইখানকার অনেক শিক্ষার্থী পানি মাড়াইয়া শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নিয়া থাকে, অনেককেই নৌকায় করিয়া বিদ্যালয়ে হাজির হইতে হয়। শুধু উহা নহে, প্রধান শিক্ষক না থাকিলে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ, হিসাবরক্ষণ এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহিত যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটে। ইহা ছাড়াও শিক্ষকদের উপস্থিতি ও পাঠদানে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি করা সম্ভব হয় না। তাহা ছাড়া সাধারণ শিক্ষকগণের উপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপের ফলে শিক্ষার মান সংকটে পতিত হয়।

আমরা জানি, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা, বিশেষত কৃষি ও মৎস্যসম্পদ সরবরাহের প্রশ্নে হাওরসমূহ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখিয়া চলিলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধার ক্ষেত্রে উহারা ভয়ংকর বঞ্চনার শিকার। নিশ্চিতভাবে বলিয়া দেওয়া যায়, আলোচ্য সমস্যাটি এই বঞ্চনা আরও বাড়াইয়া দিতেছে। হাওরের অধিকাংশ মানুষ শুধু নিম্নবিত্ত নহেন, ক্ষেত্রবিশেষে সন্তানের শিক্ষা তাহাদের অনেকের নিকট বিলাসিতার শামিল। এই অবস্থায় প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাইতে নিরুৎসাহিত হওয়াই স্বাভাবিক। মনে রাখিতে হইবে, হাওরের অধিকাংশ মানুষ সেইখানকার স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি ও মৎস্য পেশার সহিত যুক্ত, যেইখানে অনেক শিশুই কম বয়সে পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহিত যুক্ত হইয়া যায়। এই সকল কারণে হাওর অঞ্চলে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ড্রপ আউটের হারও তুলনামূলক অধিক।

অবশ্য দশকের পর দশক ধরিয়া রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে সাধারণভাবে শহরাঞ্চল অপেক্ষা গ্রামাঞ্চল শিক্ষাসহ প্রায় সর্বক্ষেত্রেই যেইভাবে পিছাইয়া রহিয়াছে, যেইখানে বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলের সহিত হাওরাঞ্চল অধিকতর বঞ্চনার শিকার, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত তিন উপজেলার বিদ্যালয়সমূহে মাসের পর মাস প্রধান শিক্ষক না থাকা বিস্ময়কর কিছু নহে। প্রসঙ্গত, আকস্মিক বন্যা বা ঢলসহ প্রকৃতির নানা বৈরী আচরণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিয়া হাওরবাসীকে জীবন নির্বাহ করিতে হয়। এই সকল ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা খুব কমই পাওয়া যায়। 
ইহা সত্য যে, সমগ্র দেশে অর্ধেকের অধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি রহিয়াছে। সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত আইনি জটিলতাও এই ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখিতেছে। তবে হাওরের ক্ষেত্রে এই জটিলতা একমাত্র কারণ নহে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাওরবহির্ভূত অঞ্চলের বহু শিক্ষক তথায় অবস্থান করিতে আগ্রহী হন না; কখনও কেহ সেইখানে নিয়োগ পাইলেও তদবির-চেষ্টা করিয়া অন্যত্র বদলি হইয়া যান। এই সমস্যার সমাধানের স্বার্থে হাওর এলাকার শিক্ষকদের বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যেইখানে ন্যূনতম প্রয়োজন মিটানো হয় না, সেইখানে অতিরিক্ত প্রণোদনা আশা করা একপ্রকার বাতুলতা।

আমরা মনে করি, হাওরকে প্রাধান্য দিয়া সমগ্র দেশেই প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করিতে হইবে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহেন এলাকার বিদ্যালয়সমূহে দায়িত্ব পালনে শিক্ষকদের উৎসাহিত করিতে বিশেষ ভাতা চালুর যেই ঘোষণা দিয়াছেন, তাহা যত দ্রুত কার্যকর হইবে ততই মঙ্গল। প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি হাওর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদসমূহে নিয়োগ ও বদলি সমন্বয় করিতে উদ্যোগ লইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে হাওরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানসম্মত শিক্ষা হইতে বঞ্চিত রাখিয়া সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নহে। সেই কারণে হাওরসহ দেশের পিছাইয়া পড়া এলাকাসমূহের জন্য সরকার আলাদা পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে পারে।

আরও পড়ুন

×