ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা বাড়ুক

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে  আলোচনা বাড়ুক
×

রিয়াজ মাহমুদ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ইতোমধ্যে আলোচনা অনেক হয়েছে। এখনও চলছে। সেসব আলোচনায় চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত হলেও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তেমন কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই বললে চলে। উপরন্তু তারা প্রায় সমস্বরে বলেই যাচ্ছেন, অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা এআরটি নামের ওই চুক্তি নাকি বাংলাদেশকে মার্কিন বাজারে তার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে। 

শুরুতে বলা দরকার, বাণিজ্য চুক্তিটি বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫ (ক) ধারা অনুসারে, রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার পর, সংসদে পেশ করার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তার কিছুই হয়নি। বরং চুক্তিটি নিয়ে এখনও গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছে সরকার। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে চুক্তির কিছু অংশ প্রকাশ পেয়েছে। সেটিই জেনেছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো। এতে দেখা যাচ্ছে কৃষি, শিল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য বা চুক্তি, সামরিক নিরাপত্তা, কূটনীতি, বন্দরব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল লেনদেন মার্কিন অনুমোদন ছাড়া স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে পারবে না বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে মার্কিন নজরদারি ও প্রত্যক্ষ উপস্থিতির উপাদান চুক্তির ভেতরে নিহিত আছে, এটি বেশ স্পষ্ট। চুক্তি মতে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য দেশ থেকে পণ্য কেনার আগে অবশ্যই মার্কিন স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো ট্রাম্প প্রশাসন প্রণীত বর্ধিত শুল্ক ফের আরোপ হবে। 

আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মূলনীতি হলো বৈষম্যহীন, উন্মুক্ত, অনুমানযোগ্য ও ন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নীতি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময়, নমনীয়তা এবং বিশেষ সুবিধা প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। ডব্লিউটিওর উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাধা কমানো এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ত্বরান্বিত করা। অথচ যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ চুক্তিতে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ পারস্পরিক ট্যারিফ হার বজায় রাখবে এবং বাংলাদেশ-মার্কিন উভয় পক্ষ সম্মত না হলে বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বা কোটা আরোপ করতে পারবে না। এ ছাড়া মার্কিন পণ্যের আমদানি সীমিত হয় এমন কোনো আমদানি অনুমতিপত্র বাংলাদেশ ব্যবহার করতে পারবে না। এতে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো স্বাধীনভাবে আমদানি-রপ্তানি করতে পারবে না। 

যুক্তরাষ্ট্র কৃষিপণ্য উৎপাদনে নিজ দেশের কৃষকদের প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি প্রদান করে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৃষি ও উৎপাদন খাতে প্রচলিত সরকারি প্রণোদনা ও ভর্তুকিব্যবস্থা বড় ধরনের আইনি ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সরাসরি ভর্তুকি নিষিদ্ধ না করা হলেও চুক্তিতে বাজারব্যবস্থা ‘বিকৃত’ হয়– এমন কিছু না করার শর্ত আরোপ করা হয়েছে বাংলাদেশের ওপর। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা কৃষিপণ্যের জুনোটিক ডিজিজ-সংক্রান্ত সনদ তারাই দেবে। এতে পণ্যের গুণগত মান যাচাইয়ের ক্ষমতা আর বাংলাদেশের হাতে থাকছে না। এ ছাড়া ব্যয়বহুল ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মার্কিন জিএম পণ্যের বীজ ঢুকলেও বাংলাদেশ বাধা দিতে পারবে না। 

দেশীয় চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ ডিম, দুধ ও মাংস বাংলাদেশি খামারিরা উৎপাদন করে। কিন্তু চুক্তি বলছে– মাংস, দুধ, ঘি, পনির, ছানা জিরো শুল্কে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে। এতে দেশীয় উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়বে। দেশের মাঝারি খামারি, কৃষি বীজ, কীটনাশক ও সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাবে। 

এই চুক্তির সর্বনাশা ছোবলে পথে বসে যাবে ওষুধশিল্প। ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশকে পেটেন্ট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এতে ওষুধের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এই আইনের বিরুদ্ধে আফ্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ার বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডগুলোকে পেটেন্ট ফি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিকাশ ঘটছে। দেশীয় চাহিদার প্রায় ৯৭ ভাগ মেটাচ্ছে স্থানীয় কোম্পানিগুলো। একই সঙ্গে প্রায় ১০০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির শর্ত মেনে আইপিও ফি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকলে দেশীয় কোম্পানি সস্তায় ওষুধ উৎপাদন করতে পারবে না। এতে ওষুধের বাণিজ্য চলে যাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে। ঝুঁকিতে পড়বে ২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা।
যুক্তরাষ্ট্র ডিজিটাল সেবা সরবরাহ করে–এমন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দেশীয় শিল্পের স্বার্থে কোনো সুরক্ষা পদক্ষেপ নিতে পারবে না। একইভাবে সামরিক, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জ্বালানি নীতিতে মার্কিন স্বার্থ বিপন্ন হয়– এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নিতে পারবে না। মার্কিন তুলা বা কাঁচামাল ব্যবহার করে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করলে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে বলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিষয়টি আদৌ স্পষ্ট নয়। মার্কিন তুলা বা কাঁচামাল আমদানির বর্তমান সময় ও খরচ হিসাব করলে শেষ পর্যন্ত লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাবে।  
সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের যেমন এ চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার, তেমনি সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক মাত্রেরই এ বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে।

রিয়াজ মাহমুদ: কবি ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×