সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন পেলেও কাজ শুরু না করায় অনিশ্চয়তা
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের কাইজার চর এলাকায় নির্মাণাধীন ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। সম্প্রতি তোলা ছবি সমকাল
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একনেকে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন পেলেও এখনও শুরু হয়নি কেন্দ্রটির মূল নির্মাণকাজ। প্রকল্প এলাকায় পড়ে আছে বিপুল পরিমাণ নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় বাড়ছে সংরক্ষণ ব্যয়, তৈরি হয়েছে চুরি ও নষ্ট হওয়ার শঙ্কা।
মাদারগঞ্জের জোড়খালী ইউনিয়নের কাইজার চরে ৩২৫ দশমিক ৬৫ একর জমিতে নির্মাণাধীন প্রকল্পটি ২০২২ সালে শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রটি থেকে বছরে প্রায় এক লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বন্যা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ে জটিলতায় প্রকল্পের কাজ ধীর হয়ে যায়। এক পর্যায়ে মূল ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমরারাজা ইনফ্রা প্রাইভেট লিমিটেডকে উপকরণ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। এরপর থেকে বড় ধরনের নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় কাজের গতি ফিরছে না। অথচ দুটি বড় ব্যাচিং প্ল্যান্ট, শ্রমিক-জনবল ও বিপুল নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করছে।
শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, প্রকল্পের সঙ্গে থাকা ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইনও পড়েছে ঝুঁকিতে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত নির্মাণাধীন এই লাইনের বিভিন্ন টাওয়ারের উপকরণ দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় চুরি ও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৯ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এক হাজার ৬১২ কোটি ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ে সংশোধিত প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের আশা ছিল, এতে অর্থায়ন ও নীতিগত জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত কাজ শুরু হবে। অনুমোদনের প্রায় এক মাস পরও মূল নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এএফআরওয়াই সুইজারল্যান্ড লিমিটেডের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন নতুন পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায়ও প্রকল্পের অগ্রগতি
বাধাগ্রস্ত হয়। পরে গত ২৫ আগস্ট ‘আটলানটা এন্টারপ্রাইজ’কে নতুন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রকল্পের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। নদীভাঙন রোধে আরসিসি ব্লক স্থাপন, মাটি ভরাট, সৌর প্যানেলের ফ্রেম তৈরি এবং সঞ্চালন লাইনের বড় একটি অংশের কাজ এগিয়েছে। এখন মূল কেন্দ্রের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করে উৎপাদনে যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে বিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি পুনর্বাসন নিয়েও রয়েছে স্থানীয়দের অভিযোগ। জমি অধিগ্রহণের পর নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ২৪১টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৈরি করা হয়েছে ঘর, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার, মসজিদ ও কবরস্থান। কিন্তু পুনর্বাসন পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় এখনও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার দুর্ভোগে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সবুরা খাতুন বলেন, সাত সদস্যের পরিবারের জন্য একটি ঘর দেওয়া হয়েছে। এত মানুষ নিয়ে সেখানে বসবাস করা কঠিন।
আরেক বাসিন্দা পারুল বেগম জানান, এখনও আশ্রয়ের ঘর পাননি তিনি। বৃষ্টি হলে ঘরের চারপাশে পানি জমে যায়, কখনও ঘরও তলিয়ে যায়।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, একনেকে অনুমোদনের পর এবার দ্রুত মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য, প্রকল্পের ছোটখাটো কাজ চলমান রয়েছে। মূল নির্মাণকাজ শিগগির শুরু হবে। এটি শুরু হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। মূল কাজ শুরু হলে সমস্যাগুলো সমাধান করে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে।
জামালপুরের জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলী বলেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি দেওয়া হয়েছে। একনেকে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- প্রকল্প অনুমোদন
- মাদারগঞ্জ
- জামালপুর