উচ্চশিক্ষা
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি নিয়ে নতুন চিন্তা চাই
মাহামুদুল হক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় সংসদে ১০ জন সংসদ সদস্য নিজ নির্বাচনী এলাকায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন ৩ সেপ্টেম্বর। প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের যুক্তিতে এমন দাবি জনপ্রিয়। ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চাই’–এই দাবি করা যত সহজ; কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, কেন চাই, কত শিক্ষার্থী পড়বে, কী ধরনের গবেষণা হবে, কত অর্থ লাগবে এবং সেখান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা কী করবে–এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তত কঠিন। কারণ, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মূল সংকট শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে বর্তমানে ১৮০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি সরকারি, ১১৭টি বেসরকারি এবং তিনটি আন্তর্জাতিক। একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসও রয়েছে দেশে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কারিগরি ও পেশাগত উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ৩৮ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছেন, যা দেশের উচ্চশিক্ষার প্রায় ৭০ শতাংশ।
বর্তমান সরকার কয়েক দিন আগে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করেছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার আরও ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চালু করে গেছে। এসব নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস, শিক্ষক, গবেষণাগার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ব্যাপক সংকট রয়েছে। এমনকি ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েও আমার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর এখনও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পায়নি। নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে কলেজের শ্রেণিকক্ষে, বিদ্যালয়ের ভবনে ও ভাড়া করা জায়গায়।
কিছুদিন আগে আমি গাজীপুর শহরে দেখলাম একটি ভবন ভাড়ার সাইনবোর্ডে লেখা: ‘বিশ্ববিদ্যালয় বা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির জন্য ভাড়া দেওয়া হবে।’ ওই ভবন মালিকের ধারণা–যে ভবনে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি করা যায়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ও করা যায়! যদিও, এটা সত্য, অনেক প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলছে এসব ভাড়া ভবনে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব করার আগে অন্তত কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন: শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চাহিদা, স্থানীয় অর্থনীতির প্রয়োজন, সম্ভাব্য কর্মসংস্থান, যোগ্য শিক্ষক পাওয়ার সুযোগ, গবেষণার সম্ভাবনা, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব এবং পরিবেশগত প্রভাব।
আর জমি, মহাপরিকল্পনা, পরিবেশগত অনুমোদন, একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসন, শিক্ষক এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ন্যূনতম প্রস্তুতি ছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তি করা উচিত নয়।
আর তা না হলে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানা হয়ে উঠবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকার ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে স্নাতক পাস বেকার আট লাখ ৮৫ হাজার। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকার ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, যেখানে জাতীয় বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট বেকারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী।
দেশে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে প্রায় সবাই মাস্টার্স করেন। উন্নত দেশগুলোতে সবাই মাস্টার্স করেন না। ওইসিডির তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত ও উচ্চ আয়ের ৩৮টি দেশের ২৫-৬৪ বছর বয়সী টারশিয়ারি স্তরের শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ ব্যাচেলর বা সমমান, ৩৫ শতাংশ মাস্টার্স বা সমমান ডিগ্রি করেছেন। বাকি ১৭ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি টারশিয়ারি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে রাষ্ট্র ও পরিবার–উভয়েরই বিপুল বিনিয়োগ হয়। শিক্ষক, ভবন, প্রশাসন, আবাসন, পরিবহন ও গবেষণায় অর্থ ব্যয় হয়। এই বিনিয়োগের পর যদি শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান না হয়, এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তির নয়; জাতির।
গবেষণা হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বিনিয়োগের একটি ক্ষেত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিচয় শুধু ক্লাস নেওয়া নয়; জ্ঞান সৃষ্টি করা। অথচ গবেষণায় বরাদ্দ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম। ইউজিসি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে ১৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে; যা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ১৬ হাজার ৩১৯ জন। এ হিসাবে প্রত্যেক শিক্ষক ওই অর্থবছরে মাত্র এক লাখ ১৭ হাজার টাকার মতো গবেষণা বরাদ্দ পেয়েছেন। এই টাকা দিয়ে একজন গবেষণা সহকারীর এক বছরের বেতনও হয় না; ল্যাবভিত্তিক গবেষণার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার খরচ মেটানোও কঠিন।
এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় যৌথ গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। উত্তরাঞ্চলে নদী, চর, কৃষি ও জলবায়ু; উপকূলে সমুদ্র ও নীল অর্থনীতি; সিলেটে হাওর ও পানি; ঢাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যবিজ্ঞান ও ডিজিটাল সমাজ–এভাবে বিশেষায়িত গবেষণা গুচ্ছ গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একই ধরনের অবকাঠামো প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে তৈরির ব্যয় কমবে। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা লক্ষ্য হওয়া উচিত।
মাহামুদুল হক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
[email protected]
- বিষয় :
- উচ্চশিক্ষা