ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সমাজ

পরীক্ষার ফলের সঙ্গে কেন আত্মহত্যার খবর আসে?

পরীক্ষার ফলের সঙ্গে কেন আত্মহত্যার খবর আসে?
×

গওহার নঈম ওয়ারা

গওহার নঈম ওয়ারা

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাইবান্ধার মেয়েটি বাল্যবিবাহের শিকার হয়েও থামেনি। পরাজিত হতে চায়নি সে। অথচ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে সব শেষ। বহু প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেও মেয়েটি ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। পড়ালেখা চালিয়ে নিতে শ্বশুরবাড়ির হাজার ধকল সামলেছে। কিন্তু পরীক্ষায় পাস না করার ধকলটা সামলাতে পারেনি। অকৃতকার্য হওয়ার খবরের এক দিন পর ১১ জুলাই, ২০২৫ দুপুরে শ্বশুরবাড়িতে সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করে সে। এই আত্মহত্যা প্রতিরোধের কোনো পথ কি ছিল না?

গত বছর এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ জন কিশোরী এবং একজন কিশোর আত্মহত্যা করে। আর আত্মহননেচ্ছু সেই কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ। আমরা সে খবরগুলোই পাই, যেগুলো পুলিশ ফাইল হওয়া পর্যন্ত পৌঁছায়। অর্থাৎ আত্মহত্যা করা এবং আত্মহত্যার চেষ্টা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাস্তবে অনেক বেশি।     
আগামী ২২ জুলাই বা তার আগে যে কোনো দিন ২০২৬ সালের এসএসসি বা মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে। ফল প্রকাশের দিনক্ষণ যতই কাছে আসতে থাকে, ততই চিন্তা বাড়ে। মিষ্টির দোকানের চিন্তা, কোচিং সেন্টারের চিন্তা, অভিভাবকদের চিন্তা, এমপিওভুক্তির তালিকায় অপেক্ষমাণ থাকা স্কুলের শিক্ষকদের চিন্তাসহ নানামুখী ভাবনা আসে মাথায়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যায় একটা আশঙ্কায়। না জানি এবারও কতগুলো তাজা প্রাণ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে ঝরে যায়!

আত্মহত্যার প্রবণতা থাকছেই
ফি বছর এসএসসি পরীক্ষার্থীর হার কমছে। যেমন ২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৯২ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল। ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারাদেশে মোট ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এ বছর (২০২৬)  এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ৩১০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। তাদের মধ্যে ৪৬ শতাংশই মাধ্যমিকের। কিন্তু আত্মহত্যার প্রবণতা কমার কোনো লক্ষণ নেই। ফল প্রকাশের পরদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সারাদেশে অকৃতকার্য বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার কারণে গণমাধ্যমে আটজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর আসে। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭তে। 
সবাই যে অকৃতকার্য হয়ে আত্মহত্যা করছে, তা নয়। যেমন বগুড়ার শেরপুরে এসএসসি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ না পাওয়ায় আত্মহত্যা করেছিল এক শিক্ষার্থী। সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও গণিতে এ প্লাস না পাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল সে। মায়ের কাছে কষ্টের কথা বলে নিজ ঘরে প্রবেশ করে ওই শিক্ষার্থী। তার মা দুপুরের খাবারের জন্য ডাকতে গেলে দেখেন, ছেলে ঘরের সিলিং ফ্যানে ঝুলছে। এ প্লাস না পেয়ে দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার ঘটনা আরও আছে।


আত্মহত্যার মতো হটকারী সিদ্ধান্তের জন্য শুধু কি শিক্ষার্থীরাই দায়ী? সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা কি এর দায় এড়াতে পারে? পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সাফল্য পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে যত হই-হুল্লোড় করা হয়; সেই তুলনায় আমরা কি একবারও ভাবি, এত ছাত্রছাত্রী কেন ফেল করেছে? তাদের মানসিক অবস্থা কেমন? এই ঘটনার সঙ্গে আরও কোনো ধরনের ঝুঁকি আছে কিনা? শুধু এই শিক্ষার্থীরা পাস করতে পারেনি বলে আমাদের কাছে একেবারে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে– এটা কি ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ!
বয়স্কদের আত্মহত্যার পেছনে মানসিক অবসাদ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রভৃতি কারণ থাকে। কিন্তু এই কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার উল্লেখযোগ্য কারণ হলো পাবলিক পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া।

সফলতার সংজ্ঞা নিয়ে ভাবতে হবে 
আমাদের শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে– জীবনের দীর্ঘ যাত্রায় পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা মাত্র ছোট্ট একটি ঘটনা। সফলতা মানে শুধু জিপিএ ৫ নয়। একজন কৃষক, শিক্ষক অথবা শ্রমিকও সফল, যদি তিনি তাঁর কাজকে ভালোবাসেন; সততার সঙ্গে জীবনযাপন করেন। 
সফলতা মানে বড় চাকরি বা নামকরা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা নয়। সফলতা হলো নিজেকে, নিজের কাজকে সম্মান করা; অন্যকে সম্মান করা এবং জীবনের প্রতি ভালোবাসা বজায় রাখা। যদি একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে, সে অন্যের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে আছে বা তার জীবনে অর্থপূর্ণ কিছু করার সুযোগ এখনও আছে, তাহলে আত্মহত্যার পথ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। 
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভালোবাসা। একজন শিক্ষার্থী যদি পরিবার, শিক্ষক এবং সমাজের ভালোবাসা ও সমর্থন অনুভব করে, তাহলে হতাশা যত গভীরই হোক না কেন, সে ফিরে আসবে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের জীবনে অভিভাবকের প্রত্যাশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান ভালো ফল করুক– এটা প্রত্যেক মা-বাবার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি পরিণত হয় অন্ধ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার চাপে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে জন্ম নেয় ভয়, ব্যর্থতার আতঙ্ক ও আত্মঘৃণা। ‘আমি যদি ফেল করি, মা-বাবাকে কী করে মুখ দেখাব’– এই প্রশ্ন অনেক সময় তাদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। শুধু সন্তানের ভালো ফলই নয়; পরিবারের উচিত তার মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির বিষয়েও সমান মনোযোগ দেওয়া।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেকে ধীরেসুস্থে চিন্তাভাবনা করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তাদের ক্ষেত্রে ইঙ্গিত পাওয়া সহজ। কিন্তু হঠাৎ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আগাম আলামত বা অনুমান করা সহজ না-ও হতে পারে। তবে কাছের মানুষ, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের পক্ষে টের পাওয়া সহজ।  

সাধারণত যেসব দেখে আভাস পাওয়া যায়: 
১. আত্মহত্যা বা মৃত্যু নিয়ে কথা বলা বা লেখা, অনেক সময় কথাবার্তায়ও ইঙ্গিত মেলে। 
২. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির প্রতি অবহেলা; 
৩. নিজেকে বন্ধু ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা; 
৪. স্কুল বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া; 
৫. কখনও মনমরা হয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখা, পরক্ষণেই খুব উৎফুল্ল হয়ে সবার সঙ্গে মেশা; 
৬. ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ঘুমের ওষুধ সংগ্রহের চেষ্টা।
তবে এসব আলামতের কোনোটা দেখা না গেলেও মন খারাপের চাপে যে কোনো শিশু-কিশোর আত্মহত্যার ঝুঁকি নিতে পারে। তাই ঘনিষ্ঠদের উচিত হবে এ ধরনের মানুষের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করা। বিশেষ করে তাকে একা থাকতে না দেওয়া।

ফেরানোর পথ  
শিশুদের বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের। দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি আর তাৎক্ষণিক যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যায়: পরীক্ষা পদ্ধতি ও ফল পদ্ধতির আশু পরিবর্তন, পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে থেকেই অভিভাবক ও মা-বাবাকে সতর্ক করে দেওয়া।

পরিবারে পরীক্ষার্থী থাকলে তাকে সব সময় চাপমুক্ত এবং ফল প্রকাশের পর বিপন্ন শিক্ষার্থীদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে হবে।। ফেসবুক ও নানা সামাজিক মাধ্যমে উদযাপনের মাত্রা উস্কানিমূলক পর্যায়ে চলে যায়। এ ধরনের উদযাপন বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে। যেহেতু আত্মহত্যার তালিকায় মেয়েদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক বেশি, তাই তাদের বিষয়টি আলাদা করে ভাবতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাসহ একজন প্রশিক্ষিত মনোসামাজিক সহায়ক থাকবেন। অভিভাবক-শিক্ষক সংঘ, ছাত্র-শিক্ষক ক্লাব ইত্যাদির সভায় বিষয়কে আলোচনার তালিকায় রাখা এবং আত্মহত্যা নিরোধক পদক্ষেপ গ্রহণ। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরির জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী দল বা কার্যকর কোনো সংগঠিত স্বেচ্ছাসেবী দল থাকলে তাদের সহযোগিতা নেওয়া। এ ছাড়াও সব ধরনের প্রচারমাধ্যমে বিষয়কে সারাবছর আলোচনায় রাখতে হবে।

আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে পরীক্ষার ফল নয়, জীবনের প্রতি ভালোবাসা থাকবে সবার আগে। শিক্ষার্থীদের পাশে থাকুন। কারণ একটি জীবন একটি ভবিষ্যৎ; তার চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নয়।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক ও শিশু অধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×