ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

আইনের শাসন বনাম ‘এবার আমাদের পালা’

আইনের শাসন বনাম ‘এবার আমাদের পালা’
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাবে হুমকি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। ১৯ জুলাই সমকালে প্রকাশিত চারটি সংবাদ: ক) পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে লুটপাটের পর গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো আ.লীগ নেতার বাড়ি। এমপির ভাইয়ের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ; খ) রাজধানীর ভাসানটেকে যুবককে পিটিয়ে হত্যা। অভিযোগ বহিষ্কৃত যুবদল নেতা সুমনের বিরুদ্ধে; গ) সাঁথিয়ায় আ.লীগ নেতাকে গলা কেটে হত্যা; ঘ) অনিয়ম-অপতৎপরতার ঘটনায় ময়মনসিংহ-১১, ভালুকার বিএনপির এমপিকে শোকজ।

গত সোমবার সন্ত্রাসীরা দুই কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। ঘটনার আগে সন্ত্রাসী ‘ডেবিট ইমন’ টেলিফোনে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে হুমকি দিয়ে বলে– ‘১৭ বছর আপনি ব্যবসা করেছেন, এখন আমরা করব।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে দুই দফায় গুলি চালানোর পেছনেও ডেবিট ইমনের হাত রয়েছে বলে পুলিশি তদন্তে জানা গেছে। অন্যদিকে নরসিংদীতে ব্যবসায়ীর কান কামড়ে নিয়ে এলাকাছাড়ার হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। 

রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এসব সন্ত্রাসের অধিকাংশের নেপথ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা দেখা যাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক কর্তৃত্ব বিস্তারে ক্ষমতাসীন দলের অনেকে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রশ্রয় ক্ষমতার দাপট হিসেবে আবির্ভূত হয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনী বিপর্যস্ত থাকায় আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে উস্কানিতে যত্রতত্র মব সন্ত্রাসসহ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতার বিস্ফোরণ ঘটে। 

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি প্রত্যাশিত হলেও পাঁচ মাসের নানা সূচক তাতে সায় দেয় না। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হয়েছেন, আহত পাঁচ হাজার ২৪৬ জন। মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৪৬ জন আহত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলি ও কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১১ জন নিহত। এ সময়ে ৩৮৩ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ছয় মাসে কারা হেফাজতে ৫৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ, একজন বিএনপি ও ৪২ জন সাধারণ কয়েদি (সমকাল, ১৬ জুলাই ২০২৬)।

২.
সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগের সময়কে মনে করিয়ে দেয়। ক্ষমতার পালাবদল হলেও পীড়ন ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তিই দেখা যাচ্ছে। মব সন্ত্রাস থেকে ভিন্নমতকে উচ্ছেদ করবার কর্তৃত্ববাদী আস্ফালন আগের মতোই খড়্গহস্ত। কে কাকে খারিজ করছেন এবং কোন এখতিয়ারে– তারও দিশা মেলে না। 

গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সাম্প্রতিক ঘোষণা রয়টার্সসূত্রে প্রচারের পর নানামুখী আলোচনা চলছে। সাধারণ বিবেচনাতে বোঝা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আইনি কাঠামোতেই তাঁকে দেশে ফিরতে হবে। তবে যে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ জুলাই হত্যাকাণ্ডের আসামিদের বিচার চলমান, সেটির সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ‘জাতির পক্ষ থেকে মেসেজ’ দিয়েছেন– সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে এলে ‘আমরা তাঁকে ম্যানিলা রোপ নামক বিশেষ দড়ি দিয়ে বানানো ফুলের মালা গলায় পরিয়ে সংবর্ধনা দেব।’ 

এই ‘আমরা’ বলতে তাজুল ইসলাম কাদের বোঝাচ্ছেন? শেখ হাসিনা যদি আদৌ আসতে পারেন ও আত্মসমর্পণ করেন; তাহলে নিশ্চয়ই আইনজীবীর মাধ্যমেই আদালতে আবেদন করবেন; হাইকোর্টে তাঁর ডেথ রেফারেন্স শুনানি কখন ও কীভাবে হয়, এসব এখনও অনির্ধারিত। নিশ্চয়ই আদালত এসব বিষয়ে যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। আদালত চাইলে তাঁকে আপিল করবার অনুমতি অবশ্যই দিতে পারেন। এ অবস্থায় সাবেক চিফ প্রসিকিউটর স্বয়ং কীভাবে ‘আমরা’ হিসেবে ফাঁসির দড়ি ঝোলাতে চান? এ ধরনের উচ্চারণ দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। 
অবশ্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আইন স্বহস্তে তুলে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রায়ই দেখা যায়। বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে কারও সঙ্গে মত না মিললে তাকে গণশত্রু আখ্যা দিয়ে নানাভাবে হেনস্তার চেষ্টাও দৃশ্যমান। বিভিন্ন টকশো, বক্তৃতা-বিবৃতিতেও ভিন্নমতকে অগ্রহণযোগ্য, সেই সঙ্গে বিচারযোগ্য করে তুলবার প্রয়াস দেখা যায়। এতে সমাজে হিংসা বাড়ছে; সুস্থ গণতান্ত্রিক বিকাশের পরিবেশ সংকুচিত হয়ে আসছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান নিশ্চিতভাবেই যাবতীয় গোষ্ঠীবাদ ও নিপীড়নতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সফল হয়েছিল। অভ্যুত্থানের পর বিরুদ্ধ মতকে সমাজচ্যুত করবার উগ্রবাদী আগ্রহ একদিকে অভ্যুত্থানের চেতনার বিরোধী, অন্যদিকে অবশ্যই সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানী।

৩.
সুবিধাবাদ ও সুযোগ সন্ধানের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারও আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সব মতের মানুষের অতুলনীয় আত্মত্যাগের পর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে গঠিত সরকারের কাছে তাই বাড়তি আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসন মানুষকে অতিষ্ঠ করেছিল; চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ, একপাক্ষিক কথোপকথনের জোয়ারে ভাটার ডাক দিয়েই এসেছিল গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত কিংবা মব সন্ত্রাসে প্রাণহানি নিয়মিত ঘটনা হয়েই রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা কিংবা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আমরা দেখি, চাঁদাবাজির চাঁদমারি হয়েই আছে স্বদেশ। সরকারি দলের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাস, অনিয়ম ও দুর্নীতিও যেন নিয়মিত ঘটনা।
‘এত বছর তারা শাসন করেছে, এবার আমাদের পালা’– অপরাজনীতির এই মানসিকতা সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষ দেখেছে। এ জন্যই সুশাসনের প্রত্যাশায় বারংবার রাজপথে রক্ত দেবার জন্য মানুষের ঢল নামে। এ-ও জানি, কল্যাণবাদী সৎ রাজনীতি কখনোই ‘আমাদের পালা’ মানসিকতা অনুমোদন করে না। আমরা জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে এই কল্যাণবাদী, সৎ রাজনীতির চর্চা দেখতেই উন্মুখ। 
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই হাজার হাজার মানুষকে বন্দি করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের কর্মী। রয়েছেন সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রত্যেকেই সুবিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার রাখেন। যারা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, তারা যেমন শাস্তি পাবেন; আবার যারা যুক্ত নন, তারা মুক্তি পাবেন। এটিই আইনের শাসনের প্রত্যয়। 
আইনের শাসন একটি দেশের গণতন্ত্রের পথ মসৃণ ও উন্মুক্ত করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের চিরকালের চাওয়া। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসনের পক্ষে দেশের সরকার ও বিরোধী দল যত বেশি প্রতিশ্রুতিশীল হবে, দেশ ততই সহিংসতা ও সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিমুক্ত হবে। আইনকে নিজের মতো চলতে দিতে হবে। সরকার, বিরোধী দল ও আরও যারা রয়েছেন; আইন সকলের জন্য সমান। এই সত্য প্রধানত সরকার মেনে সেইমতো শাসনকাজ চালাতে পারলেই সমাজের অস্থিরতা অনেকটা দূর হবে। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×