ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি

ঋণ করে ঘি খাওয়ার আত্মঘাত অব্যাহত

ঋণ করে ঘি খাওয়ার আত্মঘাত অব্যাহত
×

মইনুল ইসলাম

মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণ করে ঘি খাওয়ার নীতিতে কোনো সরকারই রাশ টেনে ধরতে চাইছে না। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ঋণের মহাসাগরে ডোবার ব্যবস্থাটি পাকাপোক্ত হয়েছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেড় বছর মেয়াদি অন্তর্বর্তী সরকার সেই ব্যবস্থাই এগিয়ে নিয়ে গেছে; নিয়ন্ত্রণের কোনো ইচ্ছাই ছিল না। আর বিএনপি সরকারও এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে সংযম প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে; বিশেষত অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের ব্যাপারে।

আমরা দেখেছি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ খাতে বরাদ্দ বাজেটের প্রধান খাত শিক্ষা ও প্রযুক্তির বরাদ্দকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। আমার আশঙ্কা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরের বাজেট থেকে সরকারি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ খাত বাজেটের ব্যয় বরাদ্দের সবচেয়ে বড় খাতে পরিণত হয়ে যাবে। তখন পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশ সরকারকেও অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের জন্য প্রতিবছর আরও বেশি ঋণ নিতে হবে। এটাই ‘ডেট ট্র্যাপ’।

বাজেটের আগে, চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ১১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতে, বৈদেশিক ঋণ কোনো দেশের জন্য তখনই বিপজ্জনক বিবেচিত হয়, যখন তা জিডিপির ৪০ শতাংশ অতিক্রম করে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে মনে হতে পারে, এখনও বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বিপজ্জনক স্তরে উন্নীত হয়নি। কিন্তু নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করলে ঘনায়মান বিপদটা বোঝা যাবে। 

যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘ফ্লো অব এক্সটার্নাল রিসোর্সেস ইনটু বাংলাদেশ’ প্রকাশনা অনুযায়ী বৈদেশিক ঋণ ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত জিডিপির ১৫ শতাংশেরও কম ছিল। তখন পর্যন্ত মোট বৈদেশিক ঋণের ৩৮ শতাংশ এসেছে বিশ্বব্যাংক থেকে; ২৪.৫ শতাংশ এসেছে এডিবি থেকে; ১৭ শতাংশ এসেছে জাইকা থেকে; ৬.৮১ শতাংশ এসেছে চীন থেকে; ৬.১৪ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে এবং মাত্র ১.৩ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে। এগুলো মূলত ‘সফট লোন’ বিবেচিত; সুদের হার কম এবং ঋণ পরিশোধের সময়ও অনেক বেশি।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ গত ৫৫ বছরে কখনোই বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। উপরন্তু ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিবছর আমাদের বৈদেশিক ঋণের সুদাসলে যে কিস্তি পরিশোধ করতে হতো, সেটাও সরকারের বাজেটের ৫ শতাংশের কম ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষের দিকে একের পর এক মেগা প্রকল্পের নামে বেধড়ক অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের কারণে সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে যায়। চোখের সামনে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা রেললাইন, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন কিংবা ঢাকা এয়ারপোর্টের তৃতীয় টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্প যতই চাকচিক্যময় হোক; প্রতিটির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বিপুল ঋণের বোঝা।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির দিন পর্যন্ত সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অথচ ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার দিনে সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল মাত্র দুই লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। এর মানে, এই দুই ঋণের স্থিতির অঙ্কের পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। এই সুবিশাল ঋণের সাগরে দাঁড়িয়ে প্রতিবছর মাথাপিছু জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখানো ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ ছাড়া কিছু নয়। এর ওপর মেগা প্রকল্প ও উন্নয়নের নামে পুঁজি লুণ্ঠনের ব্যাপার তো আছেই। 

মনে রাখতে হবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদাসলে কিস্তি পরিশোধের জন্য বাজেট বরাদ্দ ছিল আড়াই বিলিয়ন ডলারের মতো। কিন্তু ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে চার বিলিয়নেরও বেশি। আগামী অর্থবছরগুলোতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে হতে পারে। আরও গুরুতর হলো, যেভাবে অভ্যন্তরীণ খাতগুলো থেকে বর্তমান সরকার ঋণ গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরগুলোতে সরকারের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ অতিক্রম করে যেতে পারে। 
সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে সরকারি রাজস্ব বাংলাদেশের জিডিপির ৭ শতাংশের কাছাকাছি নেমে যাওয়া। এটা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও দেশের রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল; আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের পাঁচ বছরে তা কমতে কমতে ৭ শতাংশের কাছাকাছি এসে গেছে। একদিকে স্বল্প প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের মহাযজ্ঞ, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের ব্যর্থতার অনিবার্য ফল হলো সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন।

শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষের পাঁচ বছর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ দেশের জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশে স্থবির হয়ে পড়েছিল। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবছর কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর জন্য সরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছিল। অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে লাগামহীন ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী ব্যাংকিং খাতে ঋণ লুণ্ঠনের অবিশ্বাস্য দুষ্টচক্র গড়ে তুলেছিল। লুণ্ঠিত ঋণেরও সিংহভাগ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুন প্রান্তিকে এসে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়।

আক্ষেপ ও উদ্বেগের বিষয়, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পরও অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং বিএনপি সরকারের ছয় মাসে খেলাপি ঋণ কমার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং বাড়ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকায়। আর বিএনপি শাসনামলে এসে, জুন ২০২৬ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ দাঁড়াল ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। 

এই নিবন্ধ যখন লিখছি; বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। তার মানে, খেলাপিতে পরিণত হয়েছে মোট ঋণের যা ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ! পত্রিকাগুলো বলছে, বাংলাদেশ এখন খেলাপি ঋণে ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’!

অন্তর্বর্তী সরকার তখন যুক্তি দেখিয়েছিল, আওয়ামী লীগের সময় নানা কারসাজি করে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানো হতো। গণঅভ্যুত্থানের পর প্রকৃত চিত্র দেখানোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দুই বছর আগে ‘প্রকৃত চিত্র’ দেখানোর পরও কেন বেড়েই চলেছে?

মোটা কথা হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ করে ঘি খাওয়ার আত্মঘাতী যে প্রবণতা আওয়ামী লীগ সরকারের ছিল; অন্তর্বর্তী কিংবা বিএনপি সরকারও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে না। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান বিএনপি সরকারের পূর্ণ মেয়াদে ঋণের মহাসাগর থেকে দেশকে আদৌ উদ্ধার সম্ভব হবে কিনা, সন্দেহ রয়েছে। 
  
অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ; সাবেক সভাপতি,
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

আরও পড়ুন

×