ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দিবস

জন্মাষ্টমীর মর্মার্থ

জন্মাষ্টমীর মর্মার্থ
×

শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে সারাবিশ্বের কোটি কোটি ভক্ত গভীর আনন্দ ও ভক্তিভরে পালন করেন শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী। মন্দিরে কীর্তন, উপবাস, শাস্ত্রপাঠ, অভিষেক ও মহাপ্রসাদের মধ্য দিয়ে এ উৎসব উদযাপিত হয়। কিন্তু জন্মাষ্টমী কি শুধু একজন ঐতিহাসিক মহাপুরুষের জন্মদিন? বৈদিক শাস্ত্র জানায়– না। এটি সেই দিবস, যেদিন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ করুণাবশত মানবসমাজের কল্যাণে স্বয়ং আবির্ভূত হন।

সাধারণ জীব জন্মগ্রহণ করে পূর্বকর্মের ফলে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কর্মের অধীন নন। তিনি স্বয়ং ভগবান। তাই শাস্ত্রে তাঁর ‘জন্ম’কে আবির্ভাব বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের দেহ ও আত্মার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই তাঁর আবির্ভাবের উদ্দেশ্য ঘোষণা করেছেন। যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥ পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে (গীতা ৪.৭-৮)।

অর্থাৎ যখন ধর্মের অবক্ষয় ও অধর্মের প্রাধান্য ঘটে, তখন সাধুদের রক্ষা, দুষ্কৃতকারীদের দমন এবং প্রকৃত ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ভগবান আবির্ভূত হন। কৃষ্ণের আবির্ভাব তাই কোনো নির্দিষ্ট জাতি, দেশ বা সম্প্রদায়ের জন্য নয়; সমগ্র মানবজাতির জন্য। তিনি মানুষের কাছে স্মরণ করিয়ে দেন– আমরা কেবল দেহ নই; আমরা চিরন্তন আত্মা এবং আমাদের প্রকৃত পরিচয় হলো ভগবানের নিত্যসেবক।
শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে বর্ণিত হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণ মথুরার কারাগারে বাসুদেব ও দেবকীর গৃহে আবির্ভূত হন। বাহ্যিকভাবে এটি ছিল অন্ধকার, ভয় ও অত্যাচারের স্থান। কিন্তু সেই অন্ধকার কারাগারই মুহূর্তে দিব্য আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এই ঘটনার গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে। মানুষের হৃদয় যখন কাম, ক্রোধ, লোভ ও অহংকারের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়, তখন তা এক অর্থে কারাগারে পরিণত হয়। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব সেই হৃদয়কে মুক্ত করে। তাই জন্মাষ্টমী আমাদের শেখায়– প্রকৃত মুক্তি বাহ্যিক পরিবেশ বদলালে নয়; হৃদয়ে কৃষ্ণকে স্থান দিলে।

আজ অনেকের কাছে জন্মাষ্টমী মানে আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা শোভাযাত্রা। এগুলো ভক্তির সুন্দর বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত শ্রীকৃষ্ণ।
জন্মাষ্টমী উদযাপনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অংশ– উপবাস ও ইন্দ্রিয় সংযম, হরিনাম-সংকীর্তন, শ্রীমদ্ভাগবত ও গীতা শ্রবণ, শ্রীকৃষ্ণের অভিষেক ও আরাধনা, ভক্তদের সঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ। উপবাসের উদ্দেশ্য কেবল খাদ্য ত্যাগ নয়; ভোগ থেকে মনকে সরিয়ে কৃষ্ণস্মরণে নিবিষ্ট করা। তাই ভক্তি ছাড়া উপবাস অসম্পূর্ণ। আবার কৃষ্ণস্মরণ থাকলে সামান্য সেবাও পরমার্থ লাভের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানুষ মানসিক অশান্তি, ভোগবাদ, একাকিত্ব ও নৈতিক সংকটে ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে জন্মাষ্টমীর বার্তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। যখন মানুষ নিজের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে কৃষ্ণকে জীবনের কেন্দ্র করে, তখন ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ– সবই শান্তির দিকে অগ্রসর হয়।

শ্রীমদ্ভাগবতে ঘোষণা করা হয়েছে– কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্ (ভাগবত ১.৩.২৮)। শ্রীকৃষ্ণ কেবল একজন অবতার নন; স্বয়ং পরমেশ্বর। কারাগারের দরজা যেমন কৃষ্ণের আবির্ভাবে খুলে গিয়েছিল, তেমনি আমাদের হৃদয়ের বন্ধ দরজাও হরিনাম ও ভক্তির মাধ্যমে উন্মুক্ত হতে পারে। জন্মাষ্টমীর প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন আমরা কেবল কৃষ্ণের জন্ম উদযাপন করি না, বরং তাঁকে আমাদের হৃদয়ে আবির্ভূত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাই।

এই জন্মাষ্টমীতে আসুন, আমরা ভোগ নয়; ভক্তির পথ বেছে নিই। উৎসব নয়; উৎসবের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করি। তখনই জন্মাষ্টমী একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান না হয়ে আমাদের জীবনের চিরন্তন জাগরণের সূচনা হবে।

শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী: সাধারণ সম্পাদক, ইসকন বাংলাদেশ
 

আরও পড়ুন

×