ব্যবসার মুনাফার ১% ব্যয় করতে হবে সিএসআরে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর-পূর্ব মুনাফার ন্যূনতম ১ শতাংশ সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে এর চেয়েও বেশি ব্যয় করতে পারবে। এসব বিষয়সহ সার্বিক সিএসআর কার্যক্রমকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনতে জাতীয় করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) নীতিমালা, ২০২৬-এর খসড়া তৈরি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে অংশীজনের মতামত চাওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এর কোনো অভিন্ন কাঠামো নেই। ফলে কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কীভাবে তা বাস্তবায়িত ও তদারক হচ্ছে এবং এর সুফল কতটা মিলছে–এসব ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সিএসআর কার্যক্রমকে পরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও ফলাফলভিত্তিক করতে চায় সরকার।
খসড়া অনুযায়ী, নীতিমালার আওতায় পড়বে দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি। এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন বা সরকার নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি বা বহুজাতিক কোম্পানি এবং নির্ধারিত আর্থিক সীমার বেশি ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠান।
এতে বলা হয়, কোন প্রতিষ্ঠান সিএসআর নীতিমালার আওতাভুক্ত হবে এবং তাদের আর্থিক সীমা কত হবে, তা নির্ধারণ করা হবে ২০২২
সালের জাতীয় শিল্পনীতি অনুযায়ী। তবে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ না করা ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সিএসআর কার্যক্রম স্বেচ্ছাভিত্তিক রাখারপ্রস্তাব রয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও পুষ্টি, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, দারিদ্র্য হ্রাস, জীবিকা উন্নয়ন, নারী ও শিশু উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের সহায়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সিএসআরের অর্থ ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, গবেষণা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নেও অর্থ ব্যয় করা যাবে।
সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, ক্রীড়া উন্নয়ন, সড়ক নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা এবং মহামারি, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে জনকল্যাণমূলক কাজেও এ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রতি অর্থবছরে অব্যবহিত পূর্ববর্তী অর্থবছরের কর-পূর্ব মুনাফার ন্যূনতম ১ শতাংশ সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করতে হবে। প্রতিষ্ঠান চাইলে এর বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবে। বরাদ্দ, প্রকল্পভিত্তিক ব্যয় এবং অব্যয়িত অর্থের হিসাব আলাদাভাবে রাখতে হবে। নির্ধারিত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করা না গেলে এর কারণ ও পরবর্তী ব্যবহারের পরিকল্পনা বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। চলমান বহুবছর মেয়াদি প্রকল্পের অর্থ পরবর্তী অর্থবছরে ব্যবহার করা যাবে। তবে সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনায় প্রকৃত ব্যয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ প্রশাসনিক খরচ করা যাবে।
এতে বলা হয়, সিএসআর হিসেবে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ব্যয়, পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন ও প্রচার, রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনুদান, জরিমানা বা বাধ্যতামূলক ক্ষতিপূরণ, কর্মচারীর নিয়মিত বেতন-ভাতা এবং মালিক বা পরিচালকের ব্যক্তিগত সুবিধার ব্যয় গণ্য হবে না। ব্যবসায়িক উপহার ও আতিথেয়তা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবসায়িক অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও সিএসআরের আওতায় পড়বে না।
খসড়া নীতিমালায় সিএসআর কার্যক্রমের চূড়ান্ত দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা সর্বোচ্চ পরিচালনা কর্তৃপক্ষের ওপর দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এতে বলা হয়, বড় প্রতিষ্ঠানকে সিএসআর কমিটি গঠন করে প্রকল্প নির্বাচন, বাজেট, বাস্তবায়ন ও ফলাফল তদারক করতে হবে। বার্ষিক প্রতিবেদনে সিএসআর কার্যক্রম, ব্যয় ও ফলাফল তুলে ধরতে হবে।
দেশে কয়েকটি খাতে সিএসআর ব্যয়ের বিধান রয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের মোট আয়ের ১ শতাংশ বিটিআরসির সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সাল থেকে ব্যাংকগুলোকে সিএসআর কার্যক্রমে অর্থ ব্যয়ে উৎসাহ দিয়ে আসছে। ২০২২ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক সিএসআর নীতিমালা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যাতে নির্দিষ্ট কোনো ব্যয়ের হার নির্ধারণ করা হয়নি। অন্যদিকে সিএসআরকে উৎসাহ দিতে ২০১০ সালে এ খাতে ব্যয় করা অর্থে কর ছাড় দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব উদ্যোগকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় এনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যক্রম আরও পরিকল্পিত ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- ব্যবসা