ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাদা কালো

পরাশক্তির মন জোগানোর বিপজ্জনক রাজনীতি

পরাশক্তির মন জোগানোর বিপজ্জনক রাজনীতি
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কচর্চা আর্থিকভাবে তো বটেই, রাজনৈতিকভাবেও কি ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নটা মনে এলো ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্ট এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের একাধিক মন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেখে। রোববারের ওই পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, ‘এই সপ্তাহেই কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অঙ্গীকার নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরেকটি দারুণ চুক্তি করেছেন’ (বিবিসি, ৩১ আগস্ট)।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গত ৩০ এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। তখনই বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে এর প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ‘পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি’র ধারাবাহিকতা রক্ষারও সমালোচনা হয়।

বিশেষত বামপন্থিদের ভাষ্য, ওই চুক্তির মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক চাপ কমানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মার্কিনপন্থি রাজনীতি। নির্বাচিত বিএনপি সরকারও অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের জুতার মধ্যেই পা গলাল।

সার্জিও গরের রোববারের পোস্ট প্রশ্ন তোলে, আওয়ামী লীগের মেগা প্রকল্পের তীব্র সমালোচনাকারী বিএনপি মেগা কেনাকাটায় যুক্ত হলো কেন? বিদ্যমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সংগ্রামরত সরকারের জন্য অকল্পনীয় ও সন্দেহ-জাগানিয়া বটে! অকল্পনীয়, কারণ এ কেনাকাটার প্রকল্প এমন সময়ে নেওয়া হচ্ছে যখন মেট্রোরেলসহ বহু জরুরি ও জনবান্ধব প্রকল্প অর্থের অভাবে স্থগিত করেছে সরকার। সন্দেহ-জাগানিয়া, কারণ মেগা ক্রয় মানেই অতীতের মতো মেগা দুর্নীতির সুযোগ। উপরন্তু মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক জালে জড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কাও অমূলক নয়।

পোস্টে সার্জিও গর আরও লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার ইতিহাসের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট। তিনি লাখ লাখ উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করছেন।’ প্রশ্ন জাগে, বোয়িং কেনার মাধ্যমে আমরা মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থান জোগানোর দায়িত্ব নিয়েছি কিনা?

ইরান যুদ্ধে নাস্তানাবুদ হওয়ার পাশাপাশি অন্য কিছু কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে নিজের দেশে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছেন। ফলস্বরূপ নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেসের দুই কক্ষের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবি ঘটার আশঙ্কাও তুলে ধরছে বিভিন্ন জরিপ। সেখানে বাংলাদেশ কেন অক্সিজেন সরবরাহের দায়িত্ব নেবে? 
মজার ব্যাপার হলো, সার্জিও গরের পোস্টটি আসার পর অন্তত এক দিনের বেশি সময় সরকার এ নিয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি। সম্ভবত গরের অতি উচ্ছ্বাস তাদের কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে বক্তব্যটি তো অস্বীকারের সুযোগ নেই। হয়তো তাই সোমবার ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি আবদার ছিল– তাদের বোয়িংগুলো যেন ব্যবহার করা হয়। আমরা সেগুলো কিনছি এবং ব্যবহার করছি’ (সমকাল, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। তিনি অবশ্য প্রথম দফার চুক্তির ১৪টি বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন আরও বোয়িং কেনার বিষয়ে গরের বক্তব্যকে সরাসরি সমর্থন না করে একটু ঘুরিয়ে বলেছেন, ‘আরও কিছু বিমান লিজে নেওয়া হবে।’ 

সার্জিও গরের বক্তব্য সরকারকে কতটা অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা আরও স্পষ্ট হয় বিমানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে। মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, কোনো চাপে নয়, প্রয়োজনেই ওই বোয়িং কেনা হচ্ছে। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে তারা এভিয়েশন হাব বানাতে চান, তাই বিমানের ৭৯-৮০টা উড়োজাহাজ লাগবে (সমকাল, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। 

অথচ চলতি বছরের জুনে জাতীয় সংসদে তখনকার বেসামরিক বিমানমন্ত্রী আফরোজা খান রিতা জানিয়েছিলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০৩৫ সালের মধ্যে বহরে উড়োজাহাজ সংখ্যা ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে (বিবিসি, ৩১ আগস্ট)। বলা দরকার, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিমানের বহর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণে অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ ১৪টি থেকে বাড়িয়ে ২৫টিতে উন্নীত করে (প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট)।

এসব তথ্য নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এলেও তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলো থেকে বোঝা যায়, আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নয়; ট্রাম্পের মন জোগানোরই লক্ষ্যে বেশি করে বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে সরকার।

স্মরণ করা যেতে পারে, সার্জিও গর গত ৩০ জুলাই তিনি দিনের ঢাকা সফরে এসেছিলেন। আসার কয়েক দিন আগেই রাজনীতির ভার্চুয়াল মাঠ গরম হয়ে উঠেছিল। বিশেষত কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে রাজপথের পরিবর্তে সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা প্রচার করেন, সার্জিও গর আসছেন তাদের হয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলতে। দিল্লিতে নির্বাসিত দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগেই ডিসেম্বর নাগাদ ‘যে কোনো মূল্যে’ দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। গর সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে শেখ হাসিনার সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের পথ তৈরি করে যাবেন। 

ওদিকে, নিয়ম অনুযায়ী সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা বিস্ময় জাগিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। তখন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির এক বিবৃতিতে এ বৈঠকের ব্যাখ্যাও চান। স্বাভাবিকভাবে এতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওই প্রচারের আগুনে ঘি পড়ে। এখন দেখা যাচ্ছে, সার্জিও গর এখানে এসেছিলেন বস্তুত বাণিজ্য করতে। এখানে আওয়ামী লীগ বোড়ে হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, সেটিও কি নিশ্চিত করে বলা যায়?

লক্ষণীয়, ঢাকায় অবস্থানকালে গর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করার পর ঢাকার মার্কিন দূতাবাস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন (বিবিসি, ৩১ আগস্ট)।

প্রশ্ন হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামলাতে গিয়ে পরাশক্তির মন জোগানোর রাজনীতি চলবে কতদিন? সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের একটা বক্তব্য স্মরণে রাখলে হয়তো ভালো হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতা বিপদ ডেকে আনতে পারে, তবে বন্ধুত্ব মৃত্যুরও কারণ হতে পারে।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×