চট্টগ্রামের ৫ হাসপাতালের চিত্র
ডেঙ্গু-হামের মধ্যে অন্য জ্বরের প্রকোপ
চিকিৎসা নিতে আসা ৬০ শতাংশ শিশু জ্বরে ভুগছে
হাম ও ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মধ্যে চট্টগ্রামে বিপুল সংখ্যক শিশু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে তাদের কারও কারও ডেঙ্গু বা হাম শনাক্ত হলেও অনেকে শ্বাসকষ্টে ভুগছে। গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে তোলা -মো. রাশেদ
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৬ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
তিন বছর দুই মাস বয়সী আয়েশা সিদ্দিকা। প্রতিদিনের মতো রাতের খাবার খেয়ে মা-বাবার সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ে। ভোরে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে থাকে সে। বাবা হায়দার আলী মাথায় হাত দিয়ে দেখেন, জ্বর এসেছে। মেপে দেখেন, জ্বর ১০৩ ডিগ্রি। টানা তিন দিন ছিল তীব্র জ্বর। পরে যোগ হয় শ্বাসকষ্টও। চিকিৎসক দেখানো হলে তিন প্রকারের ওষুধ দেন। এতেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আয়েশাকে নিয়ে আসেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে। চিকিৎসক তাকে ভর্তির পরামর্শ দেন। পরে হাম, ডেঙ্গুসহ ছয়টি পরীক্ষা দেওয়া হয়। পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আয়েশা। গতকাল বৃহস্পতিবারও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি সে। এর মধ্যে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে তার দেড় বছরের ছোট ভাই ইশতিয়াকও।
এই দুই ভাইবোনের মতো হাম-ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মধ্যে চট্টগ্রামে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে বেশির ভাগ শিশু। হাসপাতাল, চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, কিছুদিন ধরে চিকিৎসা নিতে আসা প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে অন্তত ৬০ জনই জ্বরে আক্রান্ত, যাদের মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশের মধ্যে পরবর্তী সময়ে কারও শরীরে শনাক্ত হচ্ছে ডেঙ্গু, কারও আবার হাম। জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক শিশু কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে। এক বছরের কম ও তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।
জ্বরের রোগী বেড়ে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে হাম ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও। হাসপাতালের পাশাপাশি জ্বরের রোগী বেড়েছে চিকিৎসকের চেম্বারে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক শিশুকে দেরিতে আনায় শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা ৬০ শতাংশ শিশু জ্বরে ভুগছে
গতকাল থেকে আগের পাঁচ দিনের পাঁচটি হাসপাতালের শিশু বিভাগের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে নতুন করে চিকিৎসা নিতে আসে ৪৬৪ জন। এর মধ্যে ২৮১ শিশুর জ্বর ছিল, যা ৬০ শতাংশের বেশি। চট্টগ্রামের বিশেষায়িত মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৫২৭ জনের মধ্যে ৩২১ জনই জ্বরের রোগী, যা ৬৫ শতাংশের বেশি। জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ২৯০ জনের মধ্যে জ্বরের রোগী ১৭০ জন। চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২৬৮ জনের মধ্যে ১৬২ জনই জ্বরের রোগী, যা ৬০ শতাংশের বেশি। বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালের চার শিশু বিশেষজ্ঞের চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসে ২৪৫ জন, যার মধ্যে ১৬৯ জনই জ্বরে আক্রান্ত ছিল– যা প্রায় ৭০ শতাংশ। এসব হাসপাতালের মতো কয়েক দিন ধরে জ্বরের রোগী বেড়েছে বেসরকারি ন্যাশনাল, এভারকেয়ার, ইম্পেরিয়াল, একুশে, ডেল্টা, পপুলার, সিএসসিআর, সার্জিস্কোপ, শেভরন, মেট্রোপলিটন, সাজিনাজসহ বেশির ভাগ হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ল্যাবে।
চাপ বেড়েছে হাম ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডে
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি মাসের প্রথম তিন দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২০৫ জন, মৃত্যু হয়েছে একজনের। এর মধ্যে ২ সেপ্টেম্বর এক দিনেই আক্রান্ত হয়েছে সর্বোচ্চ ৭৮ জন।
জানুয়ারি থেকে গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ২৪১ জন, প্রাণ গেছে ছয়জনের। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে দেড় শতাধিক। আগস্ট মাসে রেকর্ড এক হাজার ২০২ জন আক্রান্ত হয়েছিল, যা চলতি বছরের আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই নতুন করে ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। গত ২ সেপ্টেম্বর এক দিনেই নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৬৬ জন। এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সাত হাজার ১৫০ জন। চিকিৎসাধীন আছে তিন শতাধিক শিশু।
হাসপাতালে সরেজমিন
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, চারটি ফ্লোরে থাকা শিশু বিভাগ ও কেবিনে শিশু রোগীতে ঠাসা। চার শতাধিক শয্যার একটিও খালি নেই। সকাল থেকে বেশ কয়েকজন রোগীকে বহির্বিভাগ থেকে ভর্তির জন্য রেফার করা হলেও শয্যা খালি না থাকায় ফিরে যেতে হয়েছে।
সপ্তম তলার শিশু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, কোনো শিশুর মুখে লাগানো হয়েছে অক্সিজেনের নল। কোনো শিশুর হাতে বা মাথায় লাগানো হয়েছে স্যালাইন। তাদের কান্না আর চিৎকারে পুরো ওয়ার্ডে অন্যরকম এক আবহ দেখা যায়। সন্তানদের এমন যন্ত্রণায় ভালো নেই মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরাও।
শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন মা-বাবারা
আট মাসের শিশু সাফওয়ান। পাঁচ দিন ধরে জ্বরে ভুগছে সে। তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি সাফওয়ানের মাথায় লাগানো হয়েছে স্যালাইনের নল। সন্তানের এমন অবস্থায় ভালো নেই তার মা শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘তিন দিন ধরে জ্বর ১০৩ ডিগ্রির নিচে নামছে না। এর মধ্যে দেখা দিয়েছে শ্বাসকষ্ট। ডেঙ্গু, হামসহ কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন ডাক্তার।’ এটুকু বলার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা কানিজ ফাতেমা বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই মেয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। বড় মেয়ের জ্বর হওয়ার তিন দিনের ব্যবধানে আক্রান্ত হয় ছোট মেয়েও। পরে তারা ভোগে কাশি ও শ্বাসকষ্টে। পাঁচ দিন চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খাওয়ানোর পরও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি বড় মেয়ে। আর ছোট মেয়েকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জিগারুল ইসলাম বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে আমি ও আমার মেয়ে জ্বরে ভুগছি। জ্বর না কমায় ডেঙ্গুসহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করেছি। গত বুধবার বাবা-মেয়ের ডেঙ্গু পজেটিভ শনাক্ত হয়েছে। এমন খারাপ সময় জীবনে আর কখনও আসেনি।’
চকবাজারের বাসিন্দা সুমন বিশ্বাস বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে মেজ ছেলেটা জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে। এলাকায় ডেঙ্গু ও হামে বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছে। তাই ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই।’
জ্বরের রোগী বাড়ায় উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্টরা
মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বাসনা রানী মুহুরী বলেন, কিছুদিন ধরে হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। বেশির ভাগই জ্বর নিয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। টানা কয়েক দিন পরও জ্বর না কমায় অনেককে ডেঙ্গু ও হামের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। যাদের মধ্যে কারও শরীরে ডেঙ্গু, কারও আবার হাম শনাক্ত হচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগের।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘ঘরে ঘরে জ্বরে আক্রান্ত শিশু রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। জ্বর আসার পর সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টও দেখা দিচ্ছে। একই পরিবারের একাধিক শিশুও এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে তিন থেকে পাঁচ দিনের জন্য কয়েক প্রকারের ওষুধ দিচ্ছি। শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়া কিছু শিশুকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শও দিতে হচ্ছে। কিছু শিশুর শ্বাসকষ্ট ভালো হতে বাড়তি সময় লাগছে। অনেক মা-বাবা শিশুদের নিয়ে অবহেলা করছেন। তারা সন্তানকে অনেক দেরিতে আনছেন। কেউ কেউ আবার ফার্মেসি থেকেও ইচ্ছেমতো সন্তানকে ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। এর ফলে আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হচ্ছে।’
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, শিশু ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে জ্বর নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা বেশি। এতে ডেঙ্গু ও হাম ওয়ার্ডে রোগীর চাপ কয়েক গুণ। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে সবাইকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু ও হামের এমন প্রাদুর্ভাবের সময়ে শিশুদের কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই চিকিৎসক দেখাতে হবে। সামান্য অবহেলায় বড় বিপদ ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাদের সচেতনতা জরুরি।
মশক নিধনে চসিকের বিশেষ কার্যক্রম
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তার রোধে সিটি করপোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মশক নিধনে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। গতকাল নগরের ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ সময় মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস করা হয়। মশার প্রজননস্থল সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়।
এ সময় চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, মশক ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।