ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ

১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে আইডিবি

১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে আইডিবি
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের (দ্বিতীয় ইউনিট) জন্য ঋণ দিচ্ছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। গতকাল বৃহস্পতিবার আইডিবির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের ১.০০৪২৯ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১২ হাজার ২৫২ কোটি টাকার অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের উপস্থিতিতে গতকাল সচিবালয়ে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের অর্থায়ন চুক্তি সই করা হয়। 

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং আইডিবির ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসে আইসামি এতে সই করেন। 
ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত বলেন, ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হচ্ছে। বাকি অর্থ সরকার ও বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে।

১৩ হাজার কোটি থেকে ৩১ হাজার কোটি টাকা
ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১০ সালে। ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ নামে প্রকল্পটি ২০১৩ সালে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরও নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের পরিধি, নকশা ও ব্যয় নিয়ে একাধিকবার পরিবর্তন আসে। ১৬ বছরে ডিপিপি সংশোধন হয়েছে ১১ বার। সর্বশেষ হিসাবে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রাথমিক অনুমোদনের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৩৮ শতাংশ।

২০২২ সালে বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। পরে আবার প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে।
২০২৩-২৪ সালের শুরুতে তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ইআরএলের নিজস্ব জমিতে বড় একটি রিফাইনারি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। এস আলম  ৮০: ২০ ইকুইটি অংশীদারিত্বে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়। এস আলম গ্রুপ প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে বার্ষিক তেল পরিশোধন ক্ষমতা ৫০ লাখ টনে উন্নীত করার কথা বলেছিল। পরবর্তী সময়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি সরকারের অংশ ন্যূনতম ৫১ শতাংশ এবং এস আলমের অংশ সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ করার সুপারিশ করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি সই হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই উদ্যোগ বাতিল করে। 

এর পর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ইআরএল-২ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একনেকের সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন সরকারি কোষাগার থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি এবং বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
এখন আইডিবির ঋণ যুক্ত হওয়ায় অর্থায়নের কাঠামোতে আবার পরিবর্তন এসেছে।

আমদানি কমবে
১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত ইআরএলের বর্তমান বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টন।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার ছিল প্রায় ৬৭ লাখ ৩০ হাজার টন। এর মধ্যে ইআরএল পরিশোধন করেছে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টন। বাকি ৫০ লাখ টনের বেশি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে।

ইআরএল-২ চালু হলে দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় অর্ধেক স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের সক্ষমতা হবে। পাশাপাশি ইউরো-৫ মানের পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন করা যাবে।
নতুন ইউনিটে বছরে প্রায় চার লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন এলপিজি, ছয় লাখ টন পেট্রোল, ১১ লাখ টন ডিজেল, দুই লাখ টন লুব বেজ অয়েল এবং প্রায় পাঁচ লাখ টন জেট ফুয়েল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। বড় জাহাজ থেকে পাইপলাইনে সরাসরি অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল খালাসের এই ব্যবস্থায় পৃথক পাইপলাইন রয়েছে। ইআরএল-২ চালু হলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাইপলাইনের পূর্ণ সক্ষমতাও কাজে লাগানো যাবে।

পিডি নিয়োগে প্রশ্ন
এদিকে গত বুধবার জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব আছমা আরা বেগমকে ইআরএল-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিপিসি ও ইআরএলের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার এই বিশেষায়িত কারিগরি প্রকল্পে খাত-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা থাকা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাদের মতে, অতীতে প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তারাই এ প্রকল্পের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, এত বড় প্রকল্পে শুধু কারিগরি জ্ঞান নয়, পরিকল্পনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও প্রয়োজন। 
মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আছমা আরা বেগম দীর্ঘদিন বাজেট ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছেন। ইআরএল-সংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। 
এ বিষয়ে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কোম্পানিগুলোর পরিচালনায় আমলারাই হর্তাকর্তা। তাদের নিয়ন্ত্রণের কারণে কোম্পানিগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। এই প্রকল্পের বিষয়গুলোর অনুমোদন দেবে মন্ত্রণালয়। তাদের লোকই যদি প্রকল্প পরিচালক হয়, তাহলে স্বার্থের সংঘাত দেখা দেবে।
এ বিষয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং জ্বালানি সচিব জিয়াউল হকের মন্তব্য জানতে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। 

 

আরও পড়ুন

×