পাস কম, তদারকি নেই, শাস্তির বিধান আছে, প্রয়োগ নেই
খুলনার বেসরকারি ১০ কলেজ
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৬ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
খুলনা-যশোর মহাসড়কের মানিকতলা মোড় থেকে ডানে চলে গেছে মধ্যপাড়া সড়ক। আঁকাবাঁকা সড়ক ধরে কিছুদূর গেলে চোখে পড়ে বিশাল খেলার মাঠ। পাশে কয়েকটি ভবন। ফটকে বড় করে লেখা– মহেশ্বরপাশা শহীদ জিয়া ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়।
১৯৯১ সালের ১৩ জুন প্রায় ৩৯০ শতক জমির ওপর কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় সংসদের তৎকালীন হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ হোসেন। তাঁর প্রভাবে পরের বছর একাডেমিক কার্যক্রমের অনুমতি এবং ১৯৯৪ সালে এমপিওভুক্তির সুবিধা পায় কলেজটি। কলেজে বর্তমানে শিক্ষক ২০ জন।
কলেজটিতে একজন শিক্ষক গড়ে চারজন শিক্ষার্থী পড়ান। তবু তাদের সবাইকে পাস করাতে পারছেন না। ২০২৫ সালে যশোর বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় এই কলেজ থেকে ৮২ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে সাতজন। ২০২৪ সালে ৭০ জনের মধ্যে আটজন ও ২০২৩ সালে ৬৪ জনের মধ্যে পাস করেছেন তিনজন। অথচ প্রতিবছর কলেজের ২০ শিক্ষককে ৫০ লাখ টাকার বেশি বেতন দিচ্ছে সরকার।
শুধু এই কলেজ নয়; শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক বেশি হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষার ফলের বিবর্ণ চিত্র খুলনার বেশির ভাগ বেসরকারি কলেজের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত ১:৩০। অর্থাৎ প্রতি ৩০ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক প্রয়োজন একজন। কিন্তু দুই মাস ধরে খুলনার ২৮টি বেসরকারি কলেজ ঘুরে দেখা গেছে, বেসরকারি কলেজগুলোর শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত গড়ে ১:৫। অথচ কলেজগুলোতে পাসের হার তলানিতে।
জানতে চাইলে খুলনার সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির সমকালকে বলেন, এলাকায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবে এবং নিয়োগ বাণিজ্যের লক্ষ্য নিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কলেজ তৈরি হয়েছে। তারপর সেখানে ইচ্ছামতো শিক্ষক নিয়োগ এবং এমপিওভুক্ত হয়েছে। কলেজগুলোর কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রাধান্য থাকায় এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি শিক্ষা বোর্ড। এই সুযোগে এমপিভুক্ত শিক্ষকদের অনেকে রাজনীতি, ভিন্ন পেশা ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। সঠিক তদারকি ও জবাবদিহি না থাকায় কলেজগুলোতে শিক্ষার মানের উন্নয়ন ঘটেনি, যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে পরীক্ষার ফলাফলে।
এমপিওভুক্তির সুবিধা
বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা মূল বেতনের শতভাগ টাকা সরকারি তহবিল থেকে পান। এ ছাড়া এক হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হিসেবে বছরে দুটি উৎসব ভাতা পান। সরকারের দেওয়া এই অর্থকে এমপিও (মান্থলি পে অর্ডার) বলা হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা প্রভাষক পদে নবম গ্রেড ও সহকারী অধ্যাপক পদে ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন পান।
এমপিও পেতে হলে আগে মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন এবং মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষকদের অনুমোদন নিতে হয়।
জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের একটি খসড়া হিসাবে দেখা গেছে, একটি বেসরকারি কলেজে ৩৫ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক থাকলে মাসিক বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের প্রতি মাসে সাড়ে আট লাখ থেকে সাড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। বছরে খরচ কোটি টাকার ওপরে। আবার বাস্তবতা হলো– এই বেতন দিয়ে বর্তমান বাজারে এই শিক্ষকদের বড় অংশ সংসার চালাতে হিমশিম খান।
উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার হালচাল
চলতি বছর খুলনার ১০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২৩ হাজার ৫৪৭ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। অথচ প্রতিটি কলেজ শিক্ষার্থীর মোট সংখ্যা দেখানো হয়েছে কয়েক গুণ। বোর্ডের নিবন্ধন সংখ্যাকেই শিক্ষার্থী সংখ্যা হিসাবে ধরে অনুসন্ধান শুরু করে সমকাল।
যশোর বোর্ড থেকে জানা গেছে, খুলনা মহানগরীতে ৩৫টি এবং জেলার ৯টি উপজেলায় ৭০টি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কলেজ রয়েছে ১৫টি। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান আটটি কলেজ পরিচালনা করে। নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি থাকায় সরকারি ও সংস্থা পরিচালিত কলেজগুলো পরীক্ষার ফলের দিক থেকে জেলায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এদের গড় পাসের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে।
মহেশ্বরপাশা শহীদ জিয়া কলেজে ৩৪৫ জন শিক্ষার্থী বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এ বছর পরীক্ষা দিয়েছেন ৫২ জন, ২০২৫ সালে ৮২ জন, ২০২৫ সালে ৭০ এবং ২০২৩ সালে ৬৪ জন পরীক্ষায় অংশ নেন।
আহসান উল্লাহ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানানো হয়েছে ৬৪০ জন। অথচ এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন ৩৪০ জন। ২০২৪ সালে ৩০৫ জন এবং ২০২৩ সালে ২৮৪ জন পরীক্ষা দিয়েছেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ৩৮৫ জন শিক্ষার্থী বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। চলতি বছর পরীক্ষা দিয়েছেন ১৮৩ জন। গত বছর দিয়েছেন ১৯৭ জন, ২০২৪ সালেও ১৯৭ জন।
সিটি গার্লস কলেজে ১৩৬ জন ছাত্রী রয়েছে বলে তাদের দাবি। এ বছর পরীক্ষা দিয়েছেন ৪৯ জন, ২০২৫ সালে ৪৯, ২০২৪ সালে ৫৭ এবং ২০২৩ সালে ৫২ জন। খুলনা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ১৫৪ জন শিক্ষার্থীর কথা কলেজের খাতায় রয়েছে। পরীক্ষা দিয়েছেন ৮৫ জন। ২০২৫ সালে পরীক্ষা দেন ১১২ জন।
শিক্ষকের সংখ্যার চেয়ে পাস সংখ্যা কম
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের সহযোগিতায় ১৯৯২ সালে খুলনা নগরীতে আহসান উল্লাহ কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন অধ্যক্ষ আলী আহমেদ। তিনি ছিলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এবং আঞ্চলিক একটি পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৯৪ সালে কলেজটি যশোর বোর্ডের স্বীকৃতি পায়।
এটি দেখে ওই বছরই এক কিলোমিটারের মধ্যে নগরীর গোবরচাকায় ‘খুলনা কলেজ’ নামে আরেকটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন খুলনা সিটি করপোরেশনের সাবেক ডেপুটি মেয়র ইখতিয়ার উদ্দিন বাবলু ও কমিশনার আনোয়ারুল কাদির খোকন। এর মধ্যে খোকন খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও কেসিসির প্যানেল মেয়র ছিলেন।
কিছুদিন পর তারা ‘জসিম উদ্দিন বালিকা মহাবিদ্যালয়’ নামে আরেকটি মহিলা কলেজ তৈরি করেন। কিন্তু দুই নেতার মনোমালিন্যের জের ধরে ইখতিয়ার উদ্দিন বাবলু কলেজটি নিজ এলাকা বানরগাতী নিয়ে যান। নাম দেন সিটি গার্লস কলেজ। এটির প্রতিষ্ঠা সালও ১৯৯৪। অল্প সময়ের মধ্যেই এমপিওভুক্ত হয় কলেজগুলো।
বর্তমানে খুলনার বেসরকারি কলেজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪২ জন শিক্ষক রয়েছেন খুলনা কলেজে। কলেজটি থেকে ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ১১২ জন অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৩০ জন। ওই কলেজটিতে যতজন শিক্ষক আছেন, তার চেয়ে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম।
একই অবস্থা এখন সিটি গার্লস কলেজে। এখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ২৫ জন। গত বছর কলেজটি থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ২৩ জন পাস করেছেন। ২০২৪ সালে ৫৯ জন অংশ নিয়ে পাস করেন ২৯ জন।
২০২৫ সালে আহসান উল্লাহ কলেজ থেকে ৩৪০ জন অংশ নিয়ে ১৮৭ জন পাস করেছেন। কলেজে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ৪০ জন।
২০০২ সালে শিক্ষাবিদ কুমারেশ বাওয়ালী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা মিলে নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় তৈরি করেন মেট্রোপলিটন কলেজ। কুমারেশের ছেলে দিবাকর বাওয়ালী হন প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। জাল সনদে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসহ নানা অভিযোগে আলোচিত কলেজটি। এখানে বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ২৯ জন। ২০২৫ সালে কলেজ থেকে ৬৫ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছিলেন মাত্র ছয়জন।
একই এলাকায় অবস্থিত আইডিয়াল কলেজ থেকে গত বছর ৪৩ জন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৯ জন। কলেজটিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ১৬ জন।
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় প্রথম কলেজ হিসেবে ১৯৮৬ সালে পাঠদান শুরু করে এমএ মজিদ ডিগ্রি কলেজ। পরে ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয়করণ করা হয়।
২০০৯ সালের নির্বাচনে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোল্লা জালাল উদ্দিন। উপজেলার গাজীরহাটে নিজের নামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এর আগে পথের বাজার মহিলা কলেজটি ওই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা মহিলা কলেজ হিসেবে নামকরণ করা হয়।
গত বছর মোল্লা জালাল উদ্দিন কলেজ থেকে ১২৬ জন অংশ নিয়ে ৫৫ জন পাস করেছেন। এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা কলেজ থেকে ৪২ জন অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২২ জন। কলেজ দুটিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন যথাক্রমে ১৭ ও ১৫ জন।
দুই কিলোমিটারে চার কলেজ
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা-২০২২ (সংশোধিত-২০২৩) অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, শিল্প এলাকা ও প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উচ্চ মাধ্যমিক মহাবিদ্যালয় স্থাপনের অন্যতম শর্ত– একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম দূরত্ব দুই কিলোমিটার হতে হবে।
বিধি লঙ্ঘন করে খুলনা শহরে দুই কিলোমিটারের মধ্যে একাধিক কলেজ দেখা গেছে। এর মধ্যে নগরীর ময়লাপোতা মোড়ে আহসান উল্লাহ কলেজ ও গোবরচাকার ভেতরে খুলনা কলেজের দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। আবার খুলনা কলেজ থেকে সোহরাওয়ার্দী কলেজের দূরত্ব এক কিলোমিটারও নয়। সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ৫০০ গজের মধ্যে রয়েছে সিটি গার্লস কলেজ। এ ছাড়া মেট্রোপলিটন কলেজ ও খুলনা আইডিয়াল কলেজের দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম।
গত বছর আহসান উল্লাহ কলেজ থেকে ৫৪ এবং সিটি গার্লস কলেজ থেকে ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। বাকি চারটিতে পাসের হার ২৭ শতাংশের মধ্যে।
ফল শোচনীয়, তবু এমপিওর চেষ্টা
নগরীর খালিশপুরে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৪ সালে। কলেজটিতে ৯ জন শিক্ষক রয়েছেন। চলতি বছর কলেজটি থেকে দুজন ছাত্রী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। ২০২৫ সালে একজন অংশ নিয়ে তিনি পাস করেন। ২০২৪ সালে পাঁচজন অংশ নিয়ে চারজন এবং ২০২৩ সালে চারজন অংশ নিয়ে একজন পাস করেন। কলেজটি এখন এমপিওভুক্ত হওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।
জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ সালমা ইয়াসমিন বলেন, ‘রেজাল্ট ভালো হবে কীভাবে? ২৩ বছর বেতন ছাড়া শিক্ষকরা পাঠদান করছেন। কতদিন এভাবে পারা যায়? এমপিও হলে শিক্ষকরা বেতন পেলে তখন ভালো করার চেষ্টা করবেন।’
খুলনা নগরীর শিপইয়ার্ড এলাকায় ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনডিপেনডেন্ট আইডিয়াল কলেজ। সেখানে বর্তমানে ১৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। চলতি বছর কলেজটি থেকে ১৫ জন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। গত বছর ২৩ জন অংশ নিয়ে পাস করেছেন তিনজন।
খুলনা লায়ন্স স্কুলের কলেজ শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে। এই শাখায় শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। গত বছর কলেজ শাখা থেকে ১৭ জন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ছয়জন পাস করেছেন। কলেজ দুটির শিক্ষকরাও এমপিওভুক্তির চেষ্টায় রয়েছেন।
তদারকি নেই, পাসের হার কমছেু
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় রয়েছে– কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের পাসের হার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার (সিটি করপোরেশন শহরে ৪০%) নিচে নেমে গেলে তা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এই ধারার অধীনে প্রথম পর্যায়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে বা পরপর তিন বছর এই ধারা লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা দায়ী শিক্ষকদের এমপিও আংশিক বা সম্পূর্ণ স্থগিত বা বাতিল করা হবে। উল্লেখিত কলেজগুলোর প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের তথ্য জানা যায়নি।
একসময় ফলাফলে শীর্ষ তালিকায় ছিল নগরীর বানরগাতী এলাকায় অবস্থিত শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ। সেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ৩৬ জন। কলেজটি থেকে গত বছর ১৯৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৫২ জন পাস করেন।
দৌলতপুরে অবস্থিত মুহসিন মহিলা কলেজ বোর্ডের সেরা দশে ছিল। গত বছর ২৯৬ জন অংশ নিয়ে পাস করেন ৮৫ জন। কলেজটিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ৩৩ জন। রায়েরমহল কলেজে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৪১ জন। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত হয়েছেন ২৩ জন। কলেজটি থেকে গত বছর ৮৩ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩১ জন পাস করেছেন।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রোকসানা পারভীন বলেন, ‘আশপাশে কয়েকটি সরকারি কলেজ হয়েছে। তাই ভালো ছাত্ররা এখানে ভর্তি হয় না। যারা হয়, তারা নিয়মিত ক্লাস করে না। ডেকেও তাদের কলেজে আনা যায় না। এ জন্য ফল খারাপ হয়।’
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খুলনার বেসরকারি অন্য কলেজগুলোতে ছাত্র অনুপাতে গড়ে পাঁচজন শিক্ষক থাকলেও কলেজগুলোতে ৬০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করতে পারছেন না বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।
নগরীর হাজী মালেক ইসলামিয়া কলেজ থেকে গত বছর ১৫৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪২ জন পাস করেন, হার ২৬ শতাংশ। কলেজটিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন ৩৩ জন।
নগরীর বয়রায় অবস্থিত ইসলামিয়া কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকের সংখ্যা ৩৯। সেখানে ২০২৫ সালে ১৩৩ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৪৬ জন এবং ২০২৪ সালে ১১৭ জন অংশ নিয়ে ৪২ জন পাস করেছেন। শিক্ষক ও পাসের সংখ্যা কাছাকাছি।
সবরুণন্নেছা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ৩২ জন। কলেজটি থেকে ২০২৫ সালে ১০৮ জন অংশ নিয়ে পাস করেছেন ৪১ জন; হার ৩৮ শতাংশ।
শাস্তির বিধান আছে, প্রয়োগ নেই
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় বলা হয়েছে, যদি দেখা যায় শিক্ষকের সংখ্যার তুলনায় পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম এবং এর পেছনে শিক্ষকদের ক্লাসে অবহেলা বা গাফিলতি দায়ী, তবে সেটিকে ‘শিক্ষাগত অসদাচরণ’ গণ্য করে শিক্ষকদের মূল বেতন গ্রেড কমিয়ে দেওয়া (পদাবনতি) বা সাময়িক বরখাস্তের জন্য গভর্নিং বডিকে নির্দেশ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের একাডেমিক স্বীকৃতি ও পাঠদান অনুমোদন বিধিমালার ধারা ৯-তে বলা হয়েছে, কোনো বেসরকারি কলেজ যদি টানা তিনটি পাবলিক পরীক্ষায় বোর্ডের গড় পাসের হারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে থাকে বা এক অঙ্কের ঘরে পাস করে, তবে বোর্ড ওই কলেজের পাঠদানের প্রাথমিক অনুমতি এবং একাডেমিক স্বীকৃতি সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারে।
কলেজগুলোতে খোঁজ নিয়ে এর একটি শাস্তির বিধানও প্রয়োগের নজির পাওয়া যায়নি।
বছরের পর বছর ফল খারাপ হওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন– জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খুলনা অঞ্চলের বর্তমান উপপরিচালক (কলেজ) ড. এস এম সাজজাদ হোসেন সমকালকে বলেন, কাজটি মূলত যশোর বোর্ডের। পরিদর্শন ও সুপারিশ করলে আমরা সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারব।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক কবুয়াত আলী বিশ্বাস বলেন, খারাপ ফলের বিষয়ে মহাপরিচালকের দপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কথা হচ্ছে। টানা খারাপ ফল করা কলেজের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি কলেজ ও ছাত্রদের দায় দিলেন শিক্ষকরা
পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ফল খারাপের কারণ জানতে সব কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছে সমকাল। কিন্তু প্রায় সব অধ্যক্ষই নেপথ্যের কারণ হিসেবে সরকারি কলেজে অতিরিক্ত ছাত্র ভর্তি এবং ছাত্রদের দায়ী করেছেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ রুমা নন্দী বলেন, সিটি, মহিলা, পাইওনিয়ারসহ অন্য সরকারি কলেজগুলো প্রতিবছর আসনের বিপরীতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করে। ভালো শিক্ষার্থীরা গুটিকয়েক কলেজে চলে যাওয়ায় অন্য কলেজগুলো শিক্ষার্থী সংকটে ভোগে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থী এসব কলেজে ভর্তি হওয়ায় তাদের ফলও খারাপ হয়।
খুলনা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম আতিকুল্লাহ বলেন, এখনকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বভাবগত পরিবর্তন এসেছে। এরা কলেজে আসে না। জোর করে ধরে এনে টেস্ট পরীক্ষা দেওয়াতে হয়। অনেকের বেতন ও ফরম পূরণের টাকাও দিয়ে দিতে হয়। শিক্ষকদের প্রচেষ্টার কমতি থাকে না। কিন্তু ছাত্রদেরও তো ভালো করার আগ্রহ থাকতে হবে।
খুলনা ইসলামিয়া কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘বর্তমান ছাত্রদের মনোজাগতিক বড় পরিবর্তন ঘটেছে। এরা ক্লাসে আসে না, ঠিকমতো লেখাপড়া করে না। বাড়ি গিয়ে ধরে আনতে হয়। আমার কলেজে দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন। আমরা নিয়মিত অভিভাবক সভা, ক্লাস পরীক্ষায় পুরস্কারের ব্যবস্থাসহ নানা উদ্যোগ নিই।’
তিনি বলেন, কলেজগুলোতে বোর্ডের তদারকিও বাড়ানো দরকার। রুটিন একটি ফরম পূরণ করে জমা দিতে হয়। কিন্তু সেটির বিষয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ নেই। এই অবস্থা উত্তরণে সরকার, বোর্ড, ছাত্র-অভিভাবক ও শিক্ষক সবাই মিলে কাজ করতে হবে।
খুলনা কলেজের গত বছর অকৃতকার্য হওয়া তিন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিবেদক। তিন অভিভাবকই এক সুরে বলেন, শিক্ষকদের চেষ্টার কমতি নেই। ওরা বাড়িতে লেখাপড়া করে না।
খুলনার শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল বাশার মোল্লা বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ হওয়ায় এই সমস্যা অনেকটা কমে গেছে। এখন একটু তদারকি বাড়ালে ভালো ফল সম্ভব। বেসরকারি কলেজ পরিচালনায় বিধি ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না। সঠিক তদারকি ও আইনের প্রয়োগের অভাবে খারাপ কলেজ আরও খারাপ হতে থাকে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারুখে আযম মু. আব্দুস ছালাম সমকালকে বলেন, খুব দ্রুত আমরা বেসরকারি কলেজগুলোর প্রধানদের নিয়ে বসব। কীভাবে শিক্ষার মান উন্নত করা যায়, চেষ্টা করব। এরপরও পরিস্থিতি উন্নত না হলে তখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।