ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি পরিস্থিতি

এলএনজি আমদানি অনিশ্চিত, কমছে দেশীয় উৎপাদনও

দুই বছর সময় চেয়েছে সরকার

এলএনজি আমদানি অনিশ্চিত, কমছে দেশীয় উৎপাদনও
×

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০০ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান গ্যাস সংকট কবে মোচন হবে– এ প্রশ্ন এখন শুধু বিশেষজ্ঞ, শিল্পোদ্যোক্তা বা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের নয়, সাধারণ মানুষেরও। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকটে লোডশেডিং, সিএনজি স্টেশনে গাড়ি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা– সব মিলিয়ে সংকটের প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির প্রায় সব স্তরে। সরকার বলছে, স্থায়ীভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর লাগবে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে এলএনজি আমদানিও নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। ফলে দুই বছর পর পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে কোথাও কারখানার উৎপাদন কমেছে, কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি এ সংকটের তাৎক্ষণিক চিত্র। কম চাপের কারণে অনেক চালক নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাসও নিতে পারছেন না। ফলে একই গাড়িকে দিনে একাধিকবার স্টেশনে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও আয় দুটিই কমছে। আবাসিক লাইনে গ্যাস পাওয়া যায় না বললে চলে। এ কারণে রান্নাঘরে নিয়মিত জ্বলছে না চুলা। 

চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ১৭০ কোটি ঘনফুট
পেট্রোবাংলার গতকাল শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৭১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট।

সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ খাতে। জাতীয় গ্রিডের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক চাহিদা ছিল ২৫২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। পাচ্ছে মাত্র ৭০-৯০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ, চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের মতো গ্যাস পায় কেন্দ্রগুলো।

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। অথচ গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা ও জ্বালানি ঘাটতিও রয়েছে। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে বাড়ছে লোডশেডিং।

গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। বছরে ১০ শতাংশ হারে চাহিদা বাড়লে দুই বছর পর তা প্রায় ২১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ, তখন গ্যাসের বর্তমান ঘাটতি কমলেও বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। 

কমছে দেশীয় গ্যাস
সংকটের বড় কারণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎসের সরবরাহ ছিল ২৫৭ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। গতকাল মোট সরবরাহ নেমেছে ২৩৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে। দেশীয় উৎসের সরবরাহ ১৬২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। প্রায় সাড়ে ছয় বছরে মোট গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৮৩ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট (২৬.২ শতাংশ)।

অর্থাৎ কয়েক বছরে দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও মোট সরবরাহ আগের পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়নি। সরকার অবশ্য উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি নিয়েছে। ১৫০টি কূপের কর্মসূচির মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে বাড়তে পারে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ঘনফুট।

তিতাস, বাখরাবাদ, মোবারকপুর ও সুনেত্র এলাকায় গভীর কূপ খননের উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার টু-ডি এবং ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটার থ্রি-ডি ভূকম্পন জরিপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি নতুন রিগ কেনার উদ্যোগও রয়েছে। তবে অনুসন্ধান, কূপ খনন ও উৎপাদনে যেতে সময় লাগে। ফলে এসব উদ্যোগের সুফল কত দ্রুত পাওয়া যাবে, সেটিই বড় বিষয়।

এলএনজিতেও অনিশ্চয়তা
দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে এলএনজি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভরসা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এ পথকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহ বিঘ্ন ঘটছে। দাম বাড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনমতো কার্গো সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৬৮টি এলএনজি কার্গো এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭১টি। জুলাই ও আগস্টে এসেছে ১৫টি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ২১টি। একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গরম থাকায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেশি থাকার কথা। এ দুই মাসে অন্তত ২০টি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী কার্গো নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন টার্মিনালে কতটা স্বস্তি
আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে মহেশখালীতে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার নতুন এলএনজি টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমইসিকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির পর প্রায় ২১ মাসে টার্মিনাল চালু করা সম্ভব। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। এতে আমদানি সক্ষমতা বাড়বে প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট।

তবে টার্মিনাল নির্মাণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বাড়তি সক্ষমতা ব্যবহার করতে নিয়মিত এলএনজি কিনতে হবে। এজন্য বৈদেশিক মুদ্রা, সরবরাহকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনা সব নিশ্চিত করতে হবে।

আপাতত বিকল্প জ্বালানির ভরসা
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল ও কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সরকার এ খাতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

ফার্নেস তেল দিয়ে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২১ টাকা ৫১ পয়সা। এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ ডলার হলে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ব্যয় ২৩ টাকার বেশি হতে পারে। ফলে সংকটকালে কিছু ক্ষেত্রে তেলচালিত কেন্দ্র ব্যবহার অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোরও সক্ষমতা রয়েছে। দেশে এসব কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কারিগরি সমস্যা ও কয়লা সরবরাহের ঘাটতিতে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের নিচে ছিল।

তবে তেল বা কয়লা দিয়ে সাময়িকভাবে ঘাটতি সামাল দেওয়া গেলেও এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যয় দুটিই বাড়বে।

স্থায়ী সমাধান কী?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। ফলে শুধু বর্তমান ঘাটতি পূরণ করলেই হবে না, বাড়তি চাহিদার ব্যবস্থাও করতে হবে। 

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আমদানিনির্ভর হলে আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি বাড়বে, আবার দেশীয় উৎস থেকেও ভবিষ্যতের পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তাই পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন এলাকায় অনুসন্ধান ও কূপ খনন দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। এলএনজি আমদানির জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তেল, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করা যেতে পারে। কারণ, গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ, শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও।

দুই বছর পর সংকট পুরোপুরি মোচন হবে–এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে এই সময়ের মধ্যে দেশীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমের মতে, এলএনজি ব্যয়বহুল হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী তা আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে, তা অগ্রাধিকার দিয়ে ঠিক করার পাশাপাশি তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন

×