ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাইট টার্ন

একজনের মেগা প্রকল্প, আরেকজনের গলার ফাঁস

একজনের মেগা প্রকল্প, আরেকজনের গলার ফাঁস
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই মাসে বাংলাদেশ প্রায় ১৮ কোটি ডলার বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই ঋণ। আর পুরোনো বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ শোধ করেছে এর আড়াই গুণের বেশি; ৪৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১১ কোটি ১৫ লাখ ডলারই সুদ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ বড় প্রকল্পগুলোর ঋণের রেয়াতকাল শেষের পথে।

প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে; সুদ সাত বিলিয়নের বেশি।

স্বাধীনতার পর থেকে আমরা সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করেছি। অর্থাৎ ৫৪ বছরে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সামনের মাত্র পাঁচ বছরে পরিশোধ করতে হবে।

এখানেই রেয়াতকালের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের আসল পরিশোধ সাধারণত পাঁচ বা ১০ বছর পর শুরু হয়। ফলে কোনো একটি সরকার ঋণ নিয়ে প্রকল্প করে দৃশ্যমান উন্নয়নের রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিলেও তা পরিশোধের বিষয় হয়তো অন্য সরকারের ঘাড়ে পড়ে।

রূপপুর এর বড় উদাহরণ। আসল পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরে; চলবে ২০ বছর। বছরে ৫০ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হতে পারে। রূপপুর ছাড়াও পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও যমুনা রেল সেতুর মতো বড় প্রকল্পের ঋণের রেয়াতকাল শেষ হচ্ছে। ফলে শেখ হাসিনা সরকারের নেওয়া ঋণের বড় চাপ তারেক রহমান সরকারকে সামলাতে হবে।

কর্ণফুলী টানেলের মতো কিছু প্রকল্প আবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরির ঝুঁকি দেখাচ্ছে। ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০২৫ সালে দৈনিক ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলার পূর্বাভাস থাকলেও বাস্তবে সাড়ে চার হাজারের মতো হালকা যানবাহন চলছে, যা পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশ। ফলে দৈনিক ১২ লাখ টাকা টোল আয়ের বিপরীতে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। তবে সব বড় প্রকল্পকে একইভাবে বিচার করা যাবে না। কোনো কোনোটির প্রত্যক্ষ আয়ের বাইরেও সময় সাশ্রয়, উৎপাদনশীলতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধির সুফল রয়েছে। যেমন জুন ২০২৬ পর্যন্ত পদ্মা সেতু থেকে তিন হাজার ৪২৯ কোটি টাকার বেশি টোল আদায় এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দুই হাজার ৫১৬ কোটি টাকার বেশি জমা হয়েছে। কোনো কিস্তিও বকেয়া নেই। 

তাই মেগা প্রকল্প ভালো, না খারাপের প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, প্রকল্প থেকে সরকারের রাজনৈতিক সুবিধা হিসাবের সময় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ের বিষয়ও গুরুত্ব পায় কিনা? মেগা প্রকল্প ঘোষণা ও উদ্বোধনের রাজনৈতিক মূল্য তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়। ১০ বছর পর ঋণের কিস্তি কে দেবে; তখনকার ভোটারের সামনে দৃশ্যমান হয় না। মেগা প্রকল্পের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী এবং সিদ্ধান্তের মূল্য পরিশোধকারী একই সরকার, এমনকি একই প্রজন্ম নাও হতে পারে।

বাংলাদেশে এই ঝুঁকি আরও গুরুতর। কারণ আমাদের রাজস্ব ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল।

আইএমএফের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর রাজস্ব ছিল জিডিপির ৭ শতাংশের কম। ফলে ঋণ ও জিডিপির অনুপাত দেখে স্বস্তি পেলেও মনে রাখতে হবে, সরকারের নেওয়া ঋণ জিডিপি শোধ করে না; ঋণ শোধ করে সরকারের রাজস্ব। পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও নতুন উন্নয়নে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়।

ফলে তারেক রহমান সরকারের সামনে শুধু আগের ঋণ সামলানো নয়, একই রাজনৈতিক প্রণোদনার ফাঁদ এড়ানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনিও চাইলে বড় বৈদেশিক ঋণে মেগা প্রকল্প করে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিতে পারেন, যার বড় কিস্তি রেয়াতকাল-পরবর্তী সরকারকে দিতে হবে। এখানেই আসে ব্যবস্থা বদলানোর প্রশ্ন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সুফল জনগণকে দিতে হলে শেখ হাসিনা সরকারের মেগা প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে তারেক রহমান সরকারের শিক্ষা নিতে হবে। 

বড় প্রকল্প বন্ধ নয়; প্রয়োজনীয় বড় প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি এর পুরো আর্থিক দায় জনগণকে আগে থেকেই জানাতে হবে। বড় বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্প অনুমোদনের আগে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া জরুরি। সুদসহ প্রকল্পের মোট দায়, রেয়াতকাল শেষে বার্ষিক আসল ও সুদ পরিশোধের বিস্তারিত, প্রত্যাশিত আয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা এবং চাহিদা পূর্বাভাসের চেয়ে ২৫ বা ৫০ শতাংশ কম হলে তার প্রভাব সহজ ভাষায় তুলে ধরতে হবে। প্রকল্প দু-তিন বছর পিছিয়ে গেলে কিংবা টাকার মূল্য ২০ বা ৩০ শতাংশ কমলে দায় কত বাড়বে এবং প্রকল্প নিজে দায় মেটাতে না পারলে অর্থ কোথা থেকে আসবে, তাও জানাতে হবে।

আজ শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে নেওয়া ঋণের দায় তারেক রহমানকে সামলাতে হচ্ছে। আমরা যদি ব্যবস্থাটি না বদলাই, কাল তারেক রহমানের নেওয়া ঋণের দায় সামলাতে হবে আরেক সরকারকে, যা দিন শেষে জনগণের ওপর বর্তাবে। তাই শুধু সরকার বা নেতা বদলানো যথেষ্ট নয়। এমন প্রতিষ্ঠান ও নিয়ম দরকার, যেখানে আজকের রাজনৈতিক কৃতিত্বের সঙ্গে ভবিষ্যতের আর্থিক দায় আজই দৃশ্যমান হবে। তখন ঋণ নিয়ে দেশকে বেকায়দায় ফেলার সিদ্ধান্তের প্রচলিত প্রণোদনা বদলাবে।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×