ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলাম ও সমাজ

দুর্যোগে সতর্কতা এবং আল্লাহর ভয় 

দুর্যোগে সতর্কতা এবং আল্লাহর ভয় 
×

মো. শাহজাহান কবীর

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব যেন এক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা। কোথাও ঘূর্ণিঝড়, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও অনাবৃষ্টি। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, ভূমিকম্প, সাগরের পানির বিপৎসীমা অতিক্রম, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস যেন আজ মানবজাতির নিত্যসঙ্গী। প্রশ্ন জাগে, এসব কি নিছক প্রাকৃতিক ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো সতর্কবার্তা?

পবিত্র কোরআন আমাদের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল; আর তিনি অনেক গুনাহ মাফ করে দেন।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩০)।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের পরীক্ষা ও সতর্কবার্তা। পবিত্র কোরআনের সুরা রূম-এর ৪১ আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণেই স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় দেখা দেয়, যাতে তারা তাদের কৃতকর্মের কিছু ফল আস্বাদন করে এবং ফিরে আসে।’
যখন সমাজে অন্যায়-অবিচার বাড়ে; জিনা-ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ে; মানুষের হক নষ্ট করা হয়; মাপে কম দেওয়া হয়; চোরাচালান বৃদ্ধি পায়, তখন আল্লাহর গজব নেমে আসে। কখনও তা দুর্ভিক্ষের রূপে, কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছদ্মবেশে আমাদের সামনে প্রকাশ পায়।
সতর্কতা অবলম্বন করা ইসলামের নির্দেশ। অলসতা নয়; আল্লাহ ভরসা বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার নাম তাওয়াক্কুল নয়। বরং সুন্নাহ হলো আগে উপায় অবলম্বন, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা।
এক সাহাবি উট না বেঁধে বললেন ‘আল্লাহর ওপর ভরসা করছি’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন: প্রথমে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো (তিরমিজি)।

দুর্যোগের ক্ষেত্রে এ হাদিসের প্রয়োগ ৪টি– 
এক: আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পেলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া; শুকনো খাবার-পানি-ওষুধ মজুত করা; বন্যার সময় উঁচু স্থান চেনা শরিয়তের হেফজে নফস তথা জীবন রক্ষার অংশ।
দুই: জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। রাস্তা থেকে গাছের ডাল সরানো, ড্রেন পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো ইমানের শাখা। (সহিহ বুখারি)। 
তিন: রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো দুর্বলকে সাহায্য করা। জাকাত, সদকা, ত্রাণ বিতরণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না। (বুখারি)। 
চার: গুজব ও আতঙ্ক না ছড়ানো। যাচাই না করে তথ্যের বিস্তার না করা। কারণ এতে মানুষের জান-মালের ক্ষতি হয়। ইসলাম ফিতনা সৃষ্টিকে কঠোরভাবে নিষেধ করে।
আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখা। সতর্কতা যদি হয় দেহের ঢাল; আল্লাহর ভয় হলো আত্মার ঢাল। দুর্যোগের সময় মানুষ দুই ভুল করে। হয় ভেঙে পড়ে, নয়তো আল্লাহকে ভুলে যায়।
আল্লাহর ভয় মানে আতঙ্ক নয়। এর অর্থ ৩টি:

১. জবাবদিহির অনুভূতি: আমি যা করছি, আল্লাহ দেখছেন। তাই ত্রাণ চুরি করব না; মজুতদারি করব না; দুর্নীতি করব না।

২. সবর ও রেজা: যা হয়েছে তা আল্লাহর ফয়সালা। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলা। এই বাক্য অন্তরে শান্তি দেয়।

৩. দোয়া ও ইস্তেগফার: প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া বইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে যেতেন, আজান দিতেন ও নামাজে মশগুল হতেন। বন্যার সময় তিনি বলতেন: আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা– আমাদের আশপাশে দাও, আমাদের ওপর নয় (বুখারি)।
আল্লাহর ভয় মানুষকে লুটপাট, মুনাফাখোরি থেকে বাঁচায়। ২০২০ সালে করোনায় যারা অক্সিজেন সিলিন্ডার কালোবাজারে বিক্রি করেছে, তাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় ছিল না। আর যারা বিনামূল্যে সেবা দিয়েছেন, তারা আল্লাহকে ভয় করেছেন বলেই পেরেছেন।

৪. সমন্বয় সাধন: হজরত উমর (রা.) এর খেলাফতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। তিনি কি শুধু নামাজ পড়েছেন? না। তিনি একদিকে রাত জেগে আল্লাহর কাছে কেঁদেছেন, অন্যদিকে প্রশাসকদের চিঠি লিখে খাদ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। নিজে চর্বি-গোশত ছেড়ে দিয়েছেন, যেন প্রজারা কষ্ট বোঝে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে সেটি, যে নেক আমলটি নিয়মিত করা হয়, তা অল্প হলেও’ (বুখারি)। তাই আমাদের উচিত সবসময় মহান আল্লাহর কাছে কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। 
সম্প্রতি নেপালে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েক হাজার মানুষ মারা গেল। এখান থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। তাই আসুন আমরা বলি: হে আল্লাহ, আপনি আমাদের একমাত্র ভরসার জায়গা; আমাদের ভুলের কারণে শাস্তি দিয়েন না! আপনি আমাদের রক্ষা করুন। আমাদের শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে মানুষের সেবা করার তাওফিক দান করুন।

ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

আরও পড়ুন

×