শরতের অমল মহিমা
অরুণ আলোর অঞ্জলি
প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
ফারুক মঈনউদ্দীন
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
শরৎকাল মানে নিঃসীম নির্মল নীলাকাশে তুষারধবল মেঘের রাশি। উপচে পড়া সাদা তুলোর মতো সেই মেঘের বিচিত্র আকৃতি ক্ষণে ক্ষণে রূপ পাল্টায়। কখনও কুয়াশার মতো হালকা, কখনও জমাট বাঁধা বরফের মতো সাদা মেঘ ভেসে যায় ধীরলয়ে, যেন সাদা পাল খাটিয়ে বয়ে যাচ্ছে উপচে পড়া তুলো বোঝাই কোনো নৌকা। নদীতীর বা লোকালয়ের প্রান্তে অজস্র শুভ্র পালক মেলে মৃদু হাওয়ায় দোলে কাশফুল। গ্রামের মানুষ নজর না করলেও শহরের মানুষ সেই কাশবনে গিয়ে ভিড় করে ছবি তোলে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে হালকা শিশিরভেজা সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে থাকে শুভ্র শিউলি ফুল। পরিণতিহীনতার ভুল বুঝতে পেরে ভোরের আলোর দেখা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিমানে ঝরে পড়াই যেন তার নিয়তি। রবীন্দ্রনাথ এই অভিমান বুঝতে পেরেই বুঝি লিখেছিলেন– ‘শিউলি ফুল, শিউলি ফুল, কেমন ভুল, এমন ভুল।/ রাতের বায় কোন্ মায়ায় আনিল হায় বনছায়ায়,/ ভোরবেলায় বারে বারেই ফিরিবারে হলি ব্যাকুল।’ শিউলির ঝরে পড়া দেখে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আক্ষেপের সুরে লিখেছিলেন, ‘শিউলি ফুলের রাশি শিশিরের আঘাতও সয় না।’ আর শারদ রাতের বুকে শিউলি ফুলের মালা দুলতে দেখেছিলেন নজরুল। তাঁর মনে হয়েছে, ‘আজ শরতে আনন্দ ধরে না রে ধরণীতে, একি অপরূপ সেজেছে বসুন্ধরা নীলে হরিতে।’ শিউলি আর কাশফুলকে এক পঙ্ক্তিতে গেঁথেছেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা–।’
এ সবই কবিমানসের কথা। আদিখ্যেতা করে শরৎকে আমরা বলি ঋতুর রানী, রবীন্দ্রনাথ বলেন ‘শারদলক্ষ্মী।’ ঋতুবৈচিত্র্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাঙালিদের যে আবেগ কাজ করে, তা বোধকরি অন্য কোনো দেশের মানুষের নেই। আমরা গর্ব করে বলি, আমাদের ষড়ঋতুর দেশ। অথচ উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের সব দেশেই ঋতু আছে মোট চারটি–গ্রীষ্ম, বসন্ত, হেমন্ত ও শীত। আবার নিরক্ষীয় বা বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে ঋতু আছে মোট দুটো–আর্দ্র বা বর্ষা এবং শুষ্ক বা গ্রীষ্ম। ঋতু নিয়ে কবিতায় বা গানে আমরা যা বলি, সে সবই হচ্ছে সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর পরিভ্রমণের সময় সূর্যকিরণের তাপমাত্রা ও প্রভাবের তারতম্যের কারণে ভূমণ্ডলের বিভিন্ন অংশে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের নানান ধরনের ভাষ্য। এখানেই কবিতা ও বিজ্ঞানের পার্থক্য–যেন নহে এ-ই সে।
আমরা যদি আবেগপ্রবণ জাতি না হতাম তাহলে আমাদের দেশেও বড়জোর চারটি ঋতুর দেখা মিলত। গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত ও শীত। শরৎ ও বসন্ত এতই ক্ষণস্থায়ী যে “মাধবী হঠাৎ কোথা হতে এল ফাগুন-দিনের স্রোতে,/ এসে হেসেই বলে, ‘যা ই যা ই যাই’।” অথচ আমাদের কবিতায় বা গানে বসন্ত আর শরৎ সব সময়ই বড় জায়গা দখল করে থাকে। শরৎ নিয়ে আমাদের যাবতীয় আবেগ কেবল কবিত্বেই সীমাবদ্ধ।
অথচ প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ভাষ্যে এটিকে কখনও বর্ষা কখনও গ্রীষ্ম বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। তা না হলে শরৎকাল শুরু হলে তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরমের কারণে ‘ভাদ্রের তালপাকা গরম’ প্রবাদের কলঙ্ক তিলকটি জুটত না এই ঋতুর কপালে।
বর্ষাকালের খালবিলে যে প্রচুর পানি থাকে, সেগুলো শুকোতে শুরু করলে সেখান থেকে জলীয় বাষ্প তৈরি হয়, তাই বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও বেড়ে যায়। দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব বা দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে আসা জলীয় বাষ্প ভর্তি বাতাস সাগরের ওপর থেকে আসে বলে সেই বাতাস ঠান্ডা হয় না। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকলে তার তাপ ধারণক্ষমতাও বেশি হয়, ফলে বাতাসটাও গরম থাকে। এই সময়ে মেঘমুক্ত আকাশের কারণে রোদের তেজও থাকে খুব বেশি। মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে বলে ভ্যাপসা গরমটা অসহনীয় হয়ে ওঠে।
আবার এই ঋতুকে বর্ষাকাল বললেও কি ভুল হবে? তা না হলে দেড়শ বছরেরও আগে বৈষ্ণব পদাবলির কবি বিদ্যাপতি রাধার বিরহের বর্ণনা দিতে গিয়ে কি লিখতেন–‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর?’ অর্থাৎ ভাদ্র মাসের ভরা বর্ষণে আমার মিলন-মন্দির শূন্য। তার মানে, এখন যেমন ভাদ্র মাসে গরমে তাল পাকে আবার তুমুল বাদলও হয়, দেড়শ-দুইশ বছর আগের অবস্থাও তেমনই ছিল।
শরৎ ও হেমন্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলেও কবিতায় বা গানে এই দুই ঋতু যতটা সোচ্চার, সাধারণ মানুষ ততটাই নাকাল হয় আবহাওয়ার চরম খামখেয়ালিতে। বর্ষায় ও গরমে মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। তুমুল বর্ষণ হলেও শীতল হয় না বাতাস, বরং জলীয় বাষ্পের কারণে অসহনীয় হয়ে ওঠে গরম। তাই শরৎ আর হেমন্তের রূপ কেবল সীমাবদ্ধ থাকে খবরের কাগজ আর কবির কল্পনায়। নির্মল নীল আকাশের শোভা দেখা যায় হাতেগোনা কয়েকদিন।
বাংলায় শরৎ আর হেমন্ত যেমন প্রায় সমার্থক হয়ে পড়েছে, পাশ্চাত্যে শরৎ বলে আলাদা কোনো ঋতু নেই, গ্রীষ্মের পর হেমন্ত ওদের শরৎও বটে। তাই ওদের সাহিত্য বা চিত্রকলায় শরৎ বা হেমন্ত ফসল তোলা, পরিপক্বতা, ক্ষয় এবং বিষণ্নতার আভাস দেয়। কখনও প্রাচুর্য এবং পরিপক্ব ফসলের কথা বললেও হেমন্ত প্রায়ই বার্ধক্য, জীবনের অন্তিম সময়ের কিংবা আসন্ন মৃত্যুর ইঙ্গিত হয়ে আসে। হেমন্তের পাতা ঝরে পড়া যেন আসন্ন মৃত্যু আর ক্ষয়ের পূর্বাভাস। তাই পাতা ঝরার এই ঋতুর আরেকটা পাশ্চাত্য নাম ‘ফল,’ অর্থাৎ পতন।
তবে উপমহাদেশে তথা হিন্দু পুরাণে শরৎকাল অত্যন্ত পবিত্র, আধ্যাত্মিক এবং উৎসবমুখর একটি ঋতু। এই ঋতুতেই হয় দেবী দুর্গার অকালবোধন। রাবণ বধের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। অথচ এই সময় দেবতারা নিদ্রিত থাকেন। রামচন্দ্র নিরুপায় হয়ে অকালে দেবীকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, এ ঘটনাটাই হচ্ছে অকালবোধন। শরৎকালে দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে মর্ত্যে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন। সেই বিজয়কে স্মরণ করে আশ্বিন মাসে উদযাপিত হয় শারদীয় দুর্গাপূজা। হিন্দু ধর্মে শরতের আরও মাহাত্ম্যের মধ্যে রয়েছে শরৎ পূর্ণিমা বা রাসপূর্ণিমা, যে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে বৃন্দাবনে যমুনা নদীর তীরে কৃষ্ণ গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা করেছিলেন, ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর মর্ত্যলোকে পরিভ্রমণ করার কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষ তথা পিতৃপক্ষ ও মহালয়া।
হেমন্ত বা শরৎকে নিয়ে কবি-শিল্পীদের আবেগের প্রতিফলন দেখা যায় প্রায় সব দেশেই। তাই শরৎ বা হেমন্তকে বলা হয় কবিদের মৌসুম। আমাদের রবীন্দ্রনাথ হেমন্তের মতো চমৎকার ঋতু নিয়ে গান লিখেছেন মাত্র পাঁচটি, এমনকি গ্রীষ্ম আর শীতকে নিয়েও লিখেছেন আরও বেশি গান, যথাক্রমে ষোলো ও বারোটি। অথচ তালপাকা গরমের শরৎকে নিয়ে লিখেছেন ৩০টি।
স্ত্রীর কাছে লেখা পত্রগুচ্ছ ‘লেটারস অন সেজান’-এ রাইনার মারিয়া রিলকে হেমন্তের ‘পাকা মাটির’ ঘ্রাণকে ব্যবহার করেছেন জীবন, পরিপক্বতা এবং ক্ষয়ের প্রাকৃতিক চক্রের সঙ্গে এক গভীর, অস্তিত্ববাদী সংযোগের রূপক হিসেবে। হেমন্ত এমনই এক অনন্য সময়, যখন পৃথিবী তার সমস্ত জীবনপ্রক্রিয়াকে একটি একক, অপ্রতিরোধ্য ঘ্রাণের অভিজ্ঞতায় ভরিয়ে তোলে, যা কেবল সমুদ্রের বিশালতার প্রতিদ্বন্দ্বী। স্বাদের সীমানার ‘তিক্ততা’ যেন নশ্বরতা এবং কবরের অন্ধকারের এক মহাজাগতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য, সুন্দর অংশ। হেমন্ত যেন পৃথিবীর পূর্ণ পরিপক্বতা এবং মাটির কাছে তার অনিবার্য প্রত্যাবর্তনের মধ্যকার মর্মস্পর্শী সংঘাতকে তুলে ধরে। তিনি লেখেন: ‘অন্য কোনো সময়েই (হেমন্ত বাদে) একটি মাত্র ঘ্রাণে নিঃশ্বাসের মতো নিজেকে গ্রহণ করতে দেয় না মাটি–সেই পাকা মাটির ঘ্রাণ এমনই, যা কোনোভাবেই সমুদ্রের ঘ্রাণের চাইতে খারাপ নয়, সেই ঘ্রাণ যেখানে স্বাদের কাছাকাছি, সেখানে তেতো, আর যেখানে তা হৃদয়ের প্রথম ধ্বনিকে স্পর্শ করে সেখানে আরও বেশি মধুর। যার অন্তরে রয়েছে গভীরতা, অন্ধকার, প্রায় কবরের মতো একটা কিছু।’ ‘হেমন্তের দিনে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘এইতো সময়, প্রভু। সুদীর্ঘ গ্রীষ্ম হলো গত। .../ পরিপক্ব করে তোলো ফলরাজি কুঞ্জবন মাঝে;/ আরো দুটো উষ্ণ দিন ওদেরকে দাও উপহার/ যেন তারা পূর্ণ হয় মধুরসে কানায় কানায়/ চূড়ান্ত মিষ্টতা ভরা তীব্রতম মদমত্ত ঝাঁঝে।’
এলান পোর গল্প ‘আশারদের বাড়ি’র প্রথম দুটো বাক্য পড়লে ক্ষয় আর পতনের হেমন্তকে চেনা যায় যেন অন্যরকমভাবে। ‘সে বছরের হেমন্তে মেঘেরা যখন আকাশ থেকে অসহনীয় দমবন্ধ করা অবস্থায় নিচে নেমে ঝুলে ছিল, তেমনই এক একঘেয়ে ধূসর নিঃশব্দ দিনে বিষণ্ন জনমানবহীন গ্রামের পথ ধরে একাকী ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলাম আমি। অবশেষে সন্ধ্যার ছায়া ঘন হয়ে নেমে আসতেই চোখের সামনে দেখা যায় আশারদের বিষণ্ন বাড়িটা।’ যে হেমন্তকে আলবেয়ার কামু বলেছেন, ‘দ্বিতীয় বসন্ত, যখন গাছের প্রতিটি পাতাই একেকটি ফুল,’ সেই হেমন্তকে এলান পো দেখছেন ধূসর দমবন্ধ করা এক ঋতু হিসেবে।
কিংবা যদি মার্কেসের অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক উপন্যাসটির কথা ধরি, এটি মোটেই হেমন্ত ঋতুর গল্প নয়, বরং একজন স্বৈরাচারী শাসকের পতন চিত্রিত করতেই ব্যবহার করা হয়েছে হেমন্তের রূপক। একটা দীর্ঘ, নিপীড়নমূলক শাসনের সমাপ্তিকে মার্কেস তুলনা করেছেন হেমন্তের সঙ্গে। প্লিনিও এপুলেইও মেনদোসার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বইটিকে ‘ক্ষমতার নিঃসঙ্গতার কবিতা’ বলে উল্লেখ করেছেন মার্কেস। এখানে তিনি হেমন্তকে দেখিয়েছেন স্বৈরাচারী সেনাশাসকের বার্ধক্য, জরা এবং মৃত্যুর প্রতিভূ হিসেবে।
শরতের আবহাওয়া আমাদের যতই কষ্ট দিক না কেন, দেশি-বিদেশি কবিদের লেখায় বরাবরই শরৎ বা হেমন্ত উঠে এসেছে মোহনীয় বর্ণনায়। কালিদাস তাঁর ‘ঋতুসংহার’ কবিতায় শরৎবন্দনা করেছেন এভাবে: ‘কাশফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, পাকা শালি ধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নববধূর মতো শরৎকাল আসে। শরতের আগমনে কাশফুল দিয়ে পৃথিবী, চাঁদের স্নিগ্ধ কিরণ দিয়ে রাত্রি, হংসদলের দিয়ে নদীর জল, শাপলা বা কুমুদ ফুল দিয়ে সরোবর, ফুলের ভারে অবনত ছাতিম গাছ দিয়ে বনাঞ্চল এবং মালতী ফুলে উপবনগুলো-চারিদিক শুভ্র রঙে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।’
রবীন্দ্রনাথ যে অমল ধবল পালের স্বপ্ন দেখিয়ে গিয়েছেন আমাদের, আজ আর সেই পাল নেই, তারপরও পথে যেতে যেতে ব্যস্ত মানুষ চোখ তুলে একবার নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ভেলার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হয়তো আবহাওয়ার নিপীড়ন বিস্মৃত হয়। আপন মনে হয়তো গেয়েও ওঠে ‘কোন্ সাগরের পার হতে আনে কোন্ সুদূরের ধন-/ ভেসে যেতে চায় মন,/ ফেলে যেতে চায় এই কিনারায় সব চাওয়া সব পাওয়া।’
- বিষয় :
- গল্প