যে সুর আজও থামেনি
শহীদ কবীর [জন্ম: ১৯৪৯]
শহীদ কবীর
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
যে সুর আজও থামেনি, আর যে সুর আজও বাজেনি—এই দুটি সুর শোনার জন্যই সারাজীবন কান পেতে থাকব।
কথাটা কোথায় কিভাবে প্রথম আমার মনে এসেছিল জানি না, তবে এর ভেতর সত্যটি স্পষ্ট। ‘স্পিরিচুয়াল ইন্টেলেকচুয়াল’ বা আধ্যাত্মিক মেধা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শেখাতে পারে না। এটি পিএইচডি করে অর্জনের বিষয় নয়; এটি পুরোপুরি একটি আধ্যাত্মিক বিষয়, যা মানুষ জন্মসূত্রে উপহার হিসেবে নিয়ে আসে। কোনো চর্চা বা গুরুর সান্নিধ্যে একে হয়তো ঘষেমেজে আরও ধারালো করা যায়, তবে মূল সত্তাটি ভেতরে থাকা চাই। আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, “আপনি এই ছবিটা কীভাবে আঁকলেন?”—আমি বলি, “আমি জানি না।” আমার মনে হয়, ছবির নিজস্ব একটি জন্মপ্রক্রিয়া আছে। আমি কেবল ব্রাশ চালিয়ে যাই; চিত্রটি কীভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়, তা আমার অজানা। তা জানেন একমাত্র কাণ্ডারী।
পিকাসোর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘গের্নিকা’র পেছনের ইতিহাসটি ভাবলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। স্পেনের বাস্ক প্রদেশের একটি শহরের নাম ‘গের্নিকা’। সেখানে হিটলারের বাহিনী যখন পরীক্ষামূলক বোমা হামলা চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে, তখন স্প্যানিশ কমিউনিস্ট পার্টি পিকাসোকে অনুরোধ করে ঘটনাটির ওপর একটি ছবি আঁকার জন্য। তখন প্যারিসে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফেয়ার চলছিল—কোনো আর্ট ফেয়ার নয়, প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি একটি স্টল নিয়েছিল। নিঃস্ব একটি রাজনৈতিক দল পিকাসোকে কোনো অর্থ দিতে পারেনি, তিনি তা দাবিও করেননি। অথচ সেই একটিমাত্র ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তিনি বিশাল আকারের সেই কালজয়ী ছবিটি এঁকেছিলেন।
আপনি যদি স্পেনের মিউজিয়ামে যান, তবে দেখবেন মূল ‘গের্নিকা’র পাশে কয়েকটি ঘর জুড়ে সংরক্ষিত আছে তার প্রাথমিক লেআউটগুলো। পিকাসো কেবল পেন্সিল দিয়ে খসড়া তৈরি করে ক্ষান্ত হননি; প্রতিটি লেআউট এচিং এবং লিথোগ্রাফ করে প্রস্তুত করেছিলেন। এসিডে ধাতব পাত ডুবিয়ে এচিং করার সেই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া স্মরণ করলে বোঝা যায়, শিল্পের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও সততা কতখানি গভীর ছিল।
আজকের দিনে এমন নিরলস সাধকের বড্ড অভাব। অথচ আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও চিন্তার জগত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। লালন ফকিরের কথাই ধরা যাক—তিনি কেবল একজন বাউল বা আধ্যাত্মিক সাধকই ছিলেন না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাস্তব সংগ্রামেও নেমেছিলেন। কুষ্টিয়ার একটি ছাপাখানায় যখন ব্রিটিশবিরোধী ও অত্যাচারবিরোধী পোস্টার ছাপা হচ্ছিল, আর ব্রিটিশরা তা ধ্বংস করতে আসে, তখন লালন লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে তা প্রতিরোধ করতে গিয়ে লড়াই করেছিলেন। এমনকি তিনি সতীদাহ প্রথা বন্ধের দাবিতেও সরব ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা সুকান্ত তাঁদের কালজয়ী লেখনীতে এসব আন্দোলনের কথা লিখেছেন সত্য, কিন্তু লালনের মতো দেহ দিয়ে সরাসরি লড়াইয়ে যুক্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল।
লালনের গানের একটি বিশেষ কথা আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। অনুরাগের একটি পদে তিনি বলেছিলেন—”ভাবুক যে সে মাটি চিনে, মাটি চিনে যে জন ভাবুক সে জন।” অর্থাৎ, মাটি না চিনলে কখনো সত্যিকারের ভাবুক বা জ্ঞানী হওয়া যায় না; কারণ সমস্ত জ্ঞানের আদি উৎস তো এই মাটিই।
প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় কারো কমতি থাকতে পারে, কিন্তু জ্ঞানী মানুষের সান্নিধ্য, প্রকৃতি আর পারিপার্শ্বিক বাতাস থেকেই সারাজীবন জীবনের এই গূঢ় অর্থগুলো শেখা যায়, শিখতে হয়।
- বিষয় :
- গল্প