ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শরতের অমল মহিমা

স্নিগ্ধতার মেঘছায়ায়

স্নিগ্ধতার মেঘছায়ায়
×

শিল্পকর্ম :: সমর মজুমদার

সমর মজুমদার

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্য যে কোনো মানুষের মতো আমারও শৈশবের কিছু স্মৃতি আছে। এবং মনে সেসবের গভীর প্রভাব পড়ে আছে। শৈশবের শরৎ মানেই—সকালে ঘুম থেকে উঠে আঙিনাজুড়ে শিউলি ফুলের মেলা। উঠান ভরে থাকা সেই সাদা শিউলির সুবাস আমাদের বিমোহিত করত। এখন বুঝতে পারি, গ্রামের এক সরল ও শান্ত মা যেমন কোনো উচ্চবাচ্য না করে নীরবে সব ভালো-মন্দ সামলে রাখেন, আমাদের শরৎপ্রকৃতিও ঠিক তেমন।
বাংলার প্রতিটি ঋতু এবং এ দেশের নারীরা গভীরভাবে বিজড়িত। একটা বিশেষ অনুধাবন আমার হয়েছে। আমাদের ভাষা, নদী, গাছপালা ও ধানক্ষেত—সব যেন বাঙালি সংস্কৃতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখার জন্যই গড়ে ওঠা। মরুভূমিতে নদী যেমন বেমানান, তেমনই এ দেশের প্রকৃতির সঙ্গে অন্য কোনো পরিবেশ মেলে না। আমাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতি একদম একাকার। শরৎকে তাই এক স্নিগ্ধ নারীর সঙ্গে তুলনা করি, যা আমাদের নদী ও গাছপালার রূপের সঙ্গেই মানায়। এভাবেই ছয়টি ঋতু ভিন্ন ভিন্ন রূপে মনের গভীরে গেঁথে গেছে।
শরতে শিউলিঝরা আঙিনায় পা ফেলে হেঁটে বেড়াতাম এক পবিত্র ও পরিপূর্ণ মন নিয়ে। সেখানে কোনো কালিমা, দুঃখ কিংবা না-পাওয়ার আক্ষেপ ছিল না। যা পেতাম, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতাম। গ্রামের এক সরল নারী যেমন তার সন্তান, সংসার ও গৃহপালিত পশুপাখিদের ভালোবেসে আগলে রাখেন, শরতের নীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘও যেন তেমন করেই পুরো প্রকৃতিকে এক মায়ায় জড়িয়ে রাখত, আজও রাখে। এই যে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য, তা অন্য কোনো ঋতুতে এত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। ছোটবেলায় এই শরৎকালেই আমাদের পাড়ায় দুর্গাপূজা হতো। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমা গড়া দেখতে দেখতে কখন যে স্কুলের সময় পার হয়ে যেত! পড়ালেখার ফাঁকে এবং স্কুল থেকে ফিরে রাতের পর রাত প্রতিমা গড়া ও পূজার আয়োজন দেখা—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হতো। ঢোল-কাঁসরের শব্দ শুনতে শুনতেই পড়ার ঘরে কাটত সময়। তখনকার আবহাওয়াটাও ছিল ভারি সুন্দর—না গরম, না ঠান্ডা। মাটির গন্ধ আর প্রকৃতির সঙ্গে সেই আবহাওয়া মিশে যেত। ঋতুগুলোর এই মাতৃরূপ এবং পূজার স্মৃতির মধ্য দিয়ে আমরা এই অঞ্চলে মাতৃরূপী শক্তিরই উদ্বোধন দেখতে পাই। তবে শৈশবে দেখা প্রকৃতির সেই রূপ এখন আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি ষাটের দশকের কথা বলছি—আজ থেকে ষাট বছর আগে ধানমন্ডিতেও রাতের বেলা শিয়ালের ডাক শোনা যেত। এত হাইরাইজ ভবন বা ইট-পাথরের জঙ্গল তখন ছিল না, গ্রামীণ পরিবেশটাই প্রাধান্য পেত। এখন সেই রূপের দেখা মিলবে কেবল ঢাকার বাইরে দিয়াবাড়ীর মতো এলাকায়, কিংবা ধানমন্ডি লেকে কারও শখে লাগানো দু-একটি কাশফুলের ঝাড়ে।

আমি প্রকৃতিতাড়িত এক মানুষ। প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং মানুষের সম্পর্কের যে মায়াময় টান, তা আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। চিত্রেও এই গভীর মায়াই ফুটে উঠেছে। তবে বর্তমানের রূপান্তর দেখে মনে এক ধরনের কষ্ট হয়। আজকের শিশুরা প্রকৃতির এই স্বাভাবিক রূপ না দেখে যান্ত্রিক পরিবেশ আর সামাজিক দূরত্ব দেখে বড় হচ্ছে। প্রযুক্তি আধুনিকতা আনলেও মাটির কুঁড়েঘর, ঢেঁকি কিংবা গরু দিয়ে হালচাষের মতো রূপগুলো গ্রাস করে ফেলেছে।
আমি প্রযুক্তিকে অস্বীকার করছি না, তবু ছোটবেলার দেখা শিকড় ও জন্মভূমির স্মৃতিরূপগুলো ক্যানভাসে ধরে রাখতে চাই। কারণ একদিন হয়তো পালতোলা নৌকা কিংবা মাটির ঘর দেখতে মানুষকে জাদুঘরে যেতে হবে। সেই গ্রামীণ রূপগুলো ফ্রেমে আটকে রাখার এই চেষ্টা আসছে প্রজন্মের মানুষদের হৃদয়ে কিছুটা হলেও প্রশান্তি দেবে।
অনেক শিল্পীই বলেন যে কেবল ছবি আঁকাই শিল্পীর কাজ নয়, ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্যানভাসে ইতিহাসের দলিলও রেখে যেতে হয়—যা হয়তো আগামী প্রজন্ম দেখার সুযোগ পাবে না। আমিও সেই ভাবনায় নিজেকে এক অর্থে ঐতিহাসিকের ভূমিকায় দেখতে পাই। অবশ্য শিল্পীর বিষয়ের কোনো শেষ নেই। যে যার মতো করে নানা ভাবনা প্রকাশ করেন। চাকরির সূত্রে আমি দীর্ঘদিন বিসিক ডিজাইন সেন্টারে বিখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসানের সান্নিধ্য পেয়েছি। তিনি দীর্ঘকাল আমাদের গ্রামীণ লোকজ শিল্প ও সংস্কৃতিকে ছবিতে ধারণ করেছেন। তাঁর কাজ আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
শৈশবের দুর্গাপূজার স্মৃতি, চারপাশের স্নিগ্ধ পরিবেশ, আশ্বিনের নরম আবহাওয়া আর শরতের শিউলি ফুলের যে গভীর টান—তা থেকে আমি কখনও বের হতে চাইনি। অনেকে মহাকাশ, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি কিংবা নানা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে চমৎকার ছবি আঁকছেন। তবে আমি সচেতনভাবেই নিজের এই চেনা জগৎটাকে বেছে নিয়েছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি এই চেনা রূপটা নিয়েই কাজ করে যেতে চাই।
শরৎকালকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে আমি পঞ্চাশ থেকে ষাটটির মতো ছবি এঁকেছি। তবে শরতের আবহাওয়া আর অনুভূতি হিসাব করলে এই সংখ্যা শতাধিক বলা যায়। অনেক ছবি হয়তো সরাসরি ‘শরতের ছবি’ নামে আঁকা হয়নি। ক্যানভাসে যখন একটি মেয়েকে শিউলি ফুল কুড়াতে দেখা যায়, তখন সহজেই বোঝা যায় ওটা শরতেরই দৃশ্য। নাম না থাকলেও মনের ভেতরের সেই শরতের আবহ চরিত্র ও প্রকৃতিতে ফুটে ওঠে। শরৎ নিয়ে বড় কোনো ক্যানভাসে কাজ করা হয়নি আমার। মূলত কাগজের ক্যানভাসে ২০ ইঞ্চি বাই ৩০ ইঞ্চি সাইজেই বেশি এঁকেছি।
শরৎ নিয়ে আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে কাশফুলের একটি ছবি ভীষণ প্রিয়, যার প্রশংসাও পেয়েছি বেশ। শহরের কাশফুল একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বন্দি থাকে, কিন্তু উন্মুক্ত প্রান্তরে বাতাসে কাশফুলের বনে বাতাসে যে আন্দোলন তৈরি হয়—ছবিটিতে সেই ঢেউয়ের সুন্দর এক আভাস আছে। সূক্ষ্ম নজর দিয়ে ক্যানভাসটি দেখলে অনুভব করা যায় কীভাবে বাতাস এসে কাশফুলের বনকে দুলিয়ে একদিক থেকে অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে। ছবিটি আপাতত বাসাতেই রয়েছে।
সামনে একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পনা চলছে, কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা শারদীয় উৎসবকেন্দ্রিক নয়। এতে মূলত মা-ছেলের সম্পর্ক বা ভাই-বোনের সম্পর্কের মতো আমাদের চারপাশের আবেগময় রূপগুলো প্রাধান্য পাবে। এগুলো চিরকালের প্রিয় বিষয়। পাশাপাশি কিছু ল্যান্ডস্কেপ রাখারও ইচ্ছে আছে। অবশ্য সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি আমার ওপর নির্ভর করে না। গ্যালারি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব পছন্দ ও বাণিজ্যিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুপক্ষ মিলেই চূড়ান্ত নির্বাচন করা হবে।
ভ্যান গগ নেদারল্যান্ডসের গ্রাম, ধানক্ষেত আর উঁকি দেওয়া লতাগুল্ম আঁকতেন। মাঝে মাঝে ভাবি, তিনি যদি এ দেশে জন্ম নিতেন, তবে আমাদের অবারিত হেমন্তের মাঠ কিংবা শরতের নির্মল রাতের আকাশ হয়তো আরও কত অপূর্ব রূপেই-না ধরা দিত! আবার এ কথাও মনে হয়, এই অঞ্চলে জন্ম নিলে তাঁর মূল্যায়ন কতটুকু হতো? নিজ দেশেও তো জীবিত অবস্থায় তিনি কোনো মর্যাদা পাননি। বহু কষ্টের পর আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার অনেক বছর পর বিশ্ববাসী তাঁর শিল্পের কদর বুঝেছে। আমাদের সমাজে জয়নুল আবেদিনের মতো শিল্পীদের কতটুকুই-বা সঠিক মূল্যায়ন করা হয়েছে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাইজ না পেলে আমাদের সমাজ তাঁকে ‘শ্রেষ্ঠ কবি’ মেনে নিতে দ্বিধা করত। পুরস্কার বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত শিল্পের সঠিক সম্মান দিতে এ দেশের মানুষের যেন এক ধরনের কৃপণতা কাজ করে।
আজকের ব্যস্ত ঢাকা শহরে ফ্ল্যাটবন্দি জীবন থেকে খোলা আকাশ দেখা যেখানে কঠিন, সেখানে বাসার দক্ষিণ দিকটা খোলা থাকায় কিছুটা হলেও গাছপালা ও আকাশ দেখার সুযোগ পাই। দক্ষিণ দিকের বাতাস আর শিশুদের খেলার কলকাকলি শহরঘেঁষা এই ফ্ল্যাটেও এক চিলতে প্রশান্তি এনে দেয়।
এই শান্তির আবহে আমাদের ছোট্ট বারান্দাটি শৈশবের এক স্মৃতির প্রতীক। আমার স্ত্রী শিউলি ফুল ভালোবাসে বলে বারান্দার এক কোণে অনেক দূর থেকে এনে একটা শিউলি গাছ লাগিয়েছিলাম। টবে গাছটি খুব বড় না হলেও নিয়মিত ফুল ফোটে। শরতের সকালে যখন বারান্দাজুড়ে শিউলি ফুল ঝরে থাকে, স্ত্রী তখন ভালোবেসে ফুলগুলো কুড়িয়ে আনে। দৃশ্যটি আমাদের শৈশবের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মনে হয়, শৈশবের সেই বাঁধভাঙা দিনগুলোরই এক টুকরো অমূল্য রূপ আমার বারান্দায় এখনও বেঁচে আছে। 

আরও পড়ুন

×