প্যারিসের প্রান্তিকে নদীজলে
ভারননের ভুয়েক্স মোলিন ভিলা
মঈনুস সুলতান
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৪ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্যারিসের প্রান্তিকে পুরোনো একটি বার্জকে কনভার্ট করে বানানো হয়েছে নৌবিহারের শৌখিন বোট। যে জেটি থেকে আমরা এ বজরায় চেপেছি– ওখান থেকে সামান্য দূরে, সেইন নদীর ঠিক মাঝামাঝি, চোখ থেকে টুপ করে ঝরে পড়া অশ্রু আকৃতির ছোট্টমোট্ট একটি দ্বীপ। ওখানকার গাছপালায় বসে আছে কয়েকটি ধবধবে সাদা সিন্ধু-সারস। ঘণ্টাখানেক হলো ভাসছি আমরা সেইন নদীর ভরা জলে। নদীটি প্রস্থে তেমন বড় কিছু না, তবে সুনাব্য, এবং জলের প্রবহমানতায় গতি আছে প্রচুর।
ডেকের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাকিয়েছিলাম, তীরে সমান্তরালভাবে চলে যাওয়া পিচঢালা সড়কের দিকে। এদিককার জীবনযাপনে মেগা মেট্রোপলিটানের বিপুল ব্যস্ততা নেই, মানুষ চলছে ঢিমেতালে। সড়ক ধরে কথা বলতে বলতে ধীরেসুস্থে বাইসাইকেল হাঁকাচ্ছে দুই তরুণ। তীরে বাঁধা অনেক দিনের ব্যবহারে মলিন দুটি বোট।
আজকের নৌবিহারে আমি একা না। হোটেল-ডে-আর্টস নামে প্যারিসের যে সরাইখানায় হালফিল আমি দিনযাপন করছি, তাতে বসবাস করা বেশ কয়েকজন পর্যটকের সাথে বোটে আমার চেনা মানুষ গারনেল সাহেব আছেন। হোটেল-ডে-আর্টসের প্রোগ্রাম অর্গানাইজার ফরাসি তরুণী আডেলিনাও আমাদের সাথে চলছে। নৌভ্রমণের জোগাড়যন্ত্র ও যাত্রার থিম নির্বাচন করেছে সে। প্যারিস থেকে সামান্য দূরে, শ-দেড়েক বছর আগে বসবাস করতেন, ইমপ্রেশনিস্ট ঘরানার জনাকয়েক নামজাদা চিত্রকর। তারা এঁকে গেছেন বর্ণাঢ্য কিছু জলস্কেপ, নির্জন প্রান্তরের পাস্তরাল দৃশ্যপট, এবং বাগিচায় প্রস্ফুটিত কুসুমে আলোর রেখাবিন্যাস। আমরা ওদিকে নৌকা ভাসিয়ে যাচ্ছি– যে দৃশ্যপটের অভিজ্ঞতায় জাদুময় হয়ে উঠেছিল তাদের ক্যানভাস, তা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করতে।
আজ সকালে কী কারণে জানি আমার মধ্যে ফিরে এসেছে ফোয়ারায় উৎসারিত জলধারার মতো উদ্দীপনা। আডেলিনার সঙ্গ পাওয়ার সম্ভাবনাও আমাকে উদ্দীপ্ত করেছে বিঘতভাবে। খুব উৎসাহের সাথে জাভাদ্বীপের দারুণ রঙচঙে একটি বাটিকের শার্ট পরে আজ বোটে সওয়ার হয়েছি।
ঘাড় বাঁকিয়ে আমি ডেকে বসে থাকা সহযাত্রী অচেনা পর্যটকদের নিরিখ করি। লালচে সানগ্লাস পরে ক্রুকাট চুলের এক পুরুষ আইপ্যাডে টাইপ করে চলেছেন নিবিড়ভাবে। তাঁর পাশে বসে, মোটরসাইকেল জ্যাকেট ও লেদারের স্কিন-টাইট প্যান্ট পরা এক আফ্রো-ফ্রেঞ্চ নারী চোখে মাসকারা পরতে পরতে চাপছেন হাই। রেলিংয়ে কোমর ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ব্লন্ড চুলের একটি মেয়ে। তার সোনালি কেশে গাঁথা র্যাবন সানগ্লাস। আস্তিন গোটানো ব্লেজার পরা এক পুরুষ তার দিকে নজর দিতে গিয়ে তাকে কষে চুমো খান। সে হেসে ভদ্রসন্তানের দু’দিনের না কামানো দাড়িতে তার করতল ঘঁষে। তাতে উৎসাহিত হন তিনি, তার ভি-শেইপের নেকলাইলে ঝোলানো লকেটটি দুই আঙুলে তুলে ধরে পাথরটি পরখ করে তা ঘুরিয়ে ফেলে দেন মেয়েটির পিঠে। তাতে প্রতিবাদ করে সে কাঁধ ঝাঁকায়। ভদ্রসন্তান এবার তার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেন বারের দিকে। ধূসর-শেডে ফিকে ফিরোজা রঙের ছোপ দেওয়া একটি মিডি ড্রেস পরেছে সে। পুরুষটির শরীরসংলগ্ন হয়ে হাঁটতে গেলে, পেছন থেকে তার কোমরকে দেখায় ভিনটেজ ওয়াইন রাখার ডিক্যান্টারের মতো।
একটি ট্রলি ঠেলে নিয়ে আসেন গারনেল সাহেব। তাতে বারবিকিউর সরঞ্জামাদি। তিনি আজ সাজগোজ করেছেন রীতিমতো ফরাসি ফ্যাশনিস্তাদের কায়দায়। সুরকি-রঙের ওয়াচকোটের সাথে মাথায় ম্যাচ করে পরা একই বর্ণের হ্যাট। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি এমন এক ধরনের ভঙ্গি করেন যে, মনে হয়, তার হাতে ধরা আছে একটি অদৃশ্য ছড়ি; তা দিয়ে যেন মিউজিক ডিরেক্টরের কায়দায় কনসার্ট শুরু হওয়ার ইশারা দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত এ সাঙ্গাতকে মিউজিক কন্ডাক্টরের মতো দেখায়।
কাছেই পালক গোঁজা হ্যাট পরে বারস্টুলে বসেছেন এক বুড়োসুড়ো মেমসাহেব। তিনি গ্লাসে আইসকিউবের সাথে হুইস্কি মিশিয়ে বরফে চিড় ধরার শব্দ শুনছেন মনোযোগ দিয়ে। তাঁর সাইড-টেবিলে রাখা সিরামিকে তৈরি একটি ফুল। প্রসূনটি দেখতে নারীদেহের জননেদ্রিয়ের মতো। সম্ভবত তিনি তা কিনেছেন প্যারিসের কোনো স্ট্রিট থেকে। ফুলটি এভাবে তৈরির পেছনে নির্ঘাত শিল্পশোভন কোনো ব্যাখ্যা আছে। প্যারিসের হাটে-বাজারে আকসার বিক্রি হচ্ছে হরেক রকমের শিল্পদ্রব্য। এখানে কিনতে পাওয়া যায়, পল গ্যঁগার তাহিতি দ্বীপের তসবির আঁকা হান্ডি-পাতিল পর্যন্ত। চাইলে সংগ্রহ করা যায় বড়সড় একটি ছাতা, তাতে রোদে ঝলমল করবে খোদ পাবলো পিকাসোর হাতে তৈরি ব্রোঞ্জের লড়াকু ষাঁড়। মেমসাহেবের সিরামিকে গড়া ফুলের দিকে আমি নজর দিচ্ছিলাম। তিনি গ্লাসটি টোস্টের কায়দায় আমার দিকে তুলে ধরে বাঁধানো-দাঁতে হেসে বলেন, ‘ইজ নট দ্য ভিউ ম্যাজিক্যাল?’ আমি তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি– ভেসে যাওয়া আরেকটি বোটের জল কেটে তৈরি সফেন তরঙ্গরেখায় রীতিমতো ড্যান্স করছে সূর্যরশ্মি।
আডেলিনার তালাশে আমি খোলা ডেকের এদিক-ওদিকে তাকাই। তার সাথে আমার তৈরি হয়েছিল বেশ বড় ধরনের ব্যবধান। গতকাল সে নিজে থেকে আবার কাছে এসেছে। আমরা একসাথে প্যারিসের স্ট্রিটে পোস্টার কিনতে গিয়েছি। তাতে আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছে সোনালির একটি সেতু। সে ফিরে আসাতে আমার মনে হয়েছে, যেন ফিরে পেয়েছি পিকপকেটে খোয়া যাওয়া ওয়ালেটটি। আমি জানাশোনা বন্ধুবান্ধবের জন্য গিফ্ট হিসেবে কিনেছি, ইমপ্রেশনিস্ট ঘরানার চিত্রাদির কিছু পোস্টার। পোস্টারগুলো নির্বাচনে সে আমাকে সহায়তা করেছে। আমি নিজের জন্যও কিনেছি ক্লদ মোনে, কমিল পিসারো ও ভ্যান গগের কয়েকটি পেইন্টিংয়ের রিপ্রিন্ট। এগুলো আমি তাকে ধার দিয়েছি বোট সাজানোর জন্য। রিপ্রিন্টের তাড়া নিয়ে নারীটি গায়েব হলো কোথায়?
ডেকের নিরিবিলি কোণে একাকী দাঁড়িয়ে চৌকশ চেহারার এক পুরুষ, সোনালি সেক্সোফোনে সুর তুলছেন আফ্রো-ক্যারিবিয়ান জ্যাজের। আডেলিনার চেনা লোক তিনি। বোটে চড়ার সময় জেটিতে হেলান দিয়ে তিনি বাজাচ্ছিলেন, ব্লুগ্রাস ঘরানার মিউজিক। সে তাঁকে আমার সাথে ইনট্রোডিউস করিয়ে দেয়। এ জ্যাজ-বাজিয়ের নাম আনডিয়ান ফিলাত গিমপু। তিনি সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র মালডোবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগত অভিবাসী। তাঁর জননী ইউক্রেনের কিয়েভের মহিলা। সংগীতের প্রশিক্ষণ পান তিনি ছেলেবেলা মস্কোতে। কিছুদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স ব্যান্ডে বাজিয়েছেন ব্লুজ ও কান্ট্রি ওয়েস্টার্ন মিউজিক। ড্রাগসের ঘোরে গাড়ি ড্রাইভ করার অভিযোগে তাঁকে এয়ারফোর্স থেকে ডিসচার্জ করা হয়েছে। তাঁর বাদনে ছড়াচ্ছে এমন একধরনের বিদগ্ধ সুরলহরী যে, চকিতে তুষারময় চাতালে আইসস্কেট করা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফিগার স্কেটার ক্রিস্টি আমাগুচির ইমেজ মনে আসে। ক্রিস্টি যে রকম আইস-রিংয়ে চাকওয়ালা জুতা পায়ে সাবলীল ভঙ্গিতে ড্যান্স করে, ঠিক সে রকম মালডোবান এ জ্যাজ-বাদকের সুরধ্বনি যেন উদ্বেগে জমে তুষার হয়ে ওঠা আমার মনোলোকে আইসস্কেট করে যাচ্ছে।
আডেলিনাকে দেখতে পাই আমি। সে বোটের দেয়ালে সেলোটেপ দিয়ে লাগাচ্ছে, ওলন্দাজ চিত্রকর ভ্যান গগের ‘বোট’ শিরোনামের একটি চিত্র। এ রিপ্রিন্টটি খরিদ করতে গতকাল সে আমাকে সহায়তা দিয়েছে। তাকে দেখামাত্র আমার গভীর-গহনে ভেসে ওঠে কবিতা পাঠের স্মৃতি। চরণগুলো বোধ করি কবি মহাদেব সাহার রচনা। একটি পঙ্ক্তি আমার চেতনায়, নষ্ট পিনের কারণে বারবার বেজে যাওয়া কলের গানের রেকর্ডে একই গানের কলির মতো ঘুরপাক খায়। ভাবি, আজ সে যদি আবার কাছাকাছি হয়, তাহলে, “অনায়াসে ডিঙাব এ কারার প্রাচীর/ ছুটে যাব নাগরাজ্যে পাতালপুরীতে...।” আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ঘুরে সে দেয়ালে লাগানো রিপ্রিন্টটি স্মুদ করে। ফ্লোরাল সিল্কের খুব সুন্দর একটি স্লিভলেস র্যাপ-ড্রেস পরেছে সে। মৃদু বাতাসে এপ্রিকট বর্ণের পট্টবস্ত্র বৃষ্টির মিহি ছাঁটের মতো জড়িয়ে যাচ্ছে নারীটির শেইপলি ফিগারে। আমি তার কাছাকাছি গিয়ে কাঁধে আলতো করে হাত ছোঁয়াই। চোখ দুটি সামান্য বড় হয়, কী যেন ভাবে, তারপর সে বলে, ‘প্যারিসের শহরতলি থেকে সামান্য দূরে যেসব গ্রাম, গমের নিরিবিলি ক্ষেত– ওসব জায়গায় ভ্যান গগ খুঁজতেন, আঁকাজোকার জন্য পাস্তোর্যাল সেটিং।’ আমি জানতে চাই, ‘কয়েকটি নৌকার প্রতিফলন-ঋদ্ধ এ চিত্রটি কি সেইন-নদীর পার নিয়ে আঁকা?’
জবাব দেয় সে, ‘সেইন থেকে বেরিয়েছে অইসি নামে একটি শাখা নদী, কাছেই, আরও আধ-ঘণ্টাখানেক, তারপর আমরা ভাসব অইসিতে। নৌকাগুলো আঁকার সেটিং ছিল অইসির নির্জন বালুচর।’ সে গ্রীবা বাঁকিয়ে ফের মন্তব্য করে, ‘প্রকরণের নিরিখে এ চিত্রটি পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট ধারার। এর বোল্ড কালার কম্পোজিশন আমাকে আকর্ষণ করে তীব্রভাবে। বাট আই স্ট্রাগল টু গেট মিনিং আউট অব দিস পেইন্টিং। আমার কিন্তু পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকরদের মধ্যে পল সেজনকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ। তাঁর চিত্রকলায় বর্ণের সাথে তন্ময়তা মিশে গিয়ে সৃষ্টি করে ভাবনাঋদ্ধ আবহ। দিস ইজ হোয়াট আই লাইক অ্যাবাউট সেজান সো মাচ। কিন্তু যে রকম নিষিদ্ধ ড্রাগস বিভ্রান্ত টিনএজারকে অ্যাট্রাক্ট করে– ঠিক সে রকম ভ্যান গগের বিমূর্ত রেখাবিন্যাস আমাকে বিমুগ্ধ করে বটে, বাট আই ডোন্ট থিংক আই আন্ডারস্ট্যান্ড হিম অল দ্যাট ওয়েল।’
আমি আলোচনা দীর্ঘায়িত করার জন্য বলি, ‘আডেলিনা, আমি জানি ইমপ্রেশনিস্ট ধারার চিত্রকলা তোমার খুব প্রিয়। ডু ইউ মাইন্ড এক্সপ্লেইন ইয়োর পার্সপেক্টিভ অন ইমপ্রেশনিজম? আমি এ বিষয় সম্পর্কে তোমার ধারণা প্রথমে শুনতে চাই। তারপর আমি চেষ্টা করব পোস্ট-ইপ্রেশনিস্টিক ধারায় সৃজিত ভ্যান গগের বোট চিত্রটির মর্মার্থ ব্যাখ্যা করতে।’
‘অলরাইট দ্যান, ইটস আ ডিল। প্লিজ আসো আমার সাথে একটু,’ বলে আডেলিনা হেঁটে যায় বোটের অন্যদিকে, বারের কাছাকাছি। ওখানকার দেয়ালে সে একটু আগে লাগিয়েছে, ক্লদ মোনের আঁকা ‘ইমপ্রেশন সানরাইজ’ শিরোনামে চিত্রটির রিপ্রিন্ট। তাতে সূর্যাস্তের স্বর্ণালি রেখা যেন একঝাঁক উজ্জ্বল গোল্ডফিশের মতো নদীজলে ঘাই মেরে আলোড়ন তুলছে। আমি অবগত যে, ১৮৬০ সালের দিকে ফরাসি-দেশে যখন পহেলা ইমপ্রেশনিস্ট ধারায় আঁকাজোকার সূত্রপাত হয়, তখন এ চিত্রের শিরোনাম থেকে চালু হয় ইমপ্রেশনিজম টার্মটি। আডেলিনা চিত্রটির দিকে ইশারা করে যেন চোখেমুখে মেখে নেয়, পট থেকে বিচ্ছুরিত আলোর অলীক কণা। তারপর পবিত্র স্তোস্ত্র উচ্চারণের তো মতো গাঢ়স্বরে বলে, ‘চলমান মুহূর্তের ভিজ্যুয়াল ইমপ্রেশনকে ধারণ করাই এ ফর্মে আঁকা চিত্রকলার প্রধান বৈশিষ্ট। চিত্রকর জোর দেন– কীভাবে আলোর প্রতিফলনে বিবর্তিত হয় দ্রষ্টব্যের আদি বর্ণ, তার ওপর। যে রকম একটি দৃশ্য দর্শকের চোখে প্রতিভাত হয়, তা কিন্তু চিত্রকর অবিকল আঁকেন না; বরং তিনি প্রকাশ করেন এ দৃশ্যসঞ্জাত অনুভূতিকে। বর্ণের আবছা স্পর্শে দৃশ্যরূপকে এমনভাবে প্রকাশ করেন যে, তা আদতে দর্শকের চোখে সৃষ্টি করে আলোর মতিভ্রম। দিস ইজ হোয়াট আই থিংক ইমপ্রেশনিজম ইজ অল অ্যাবাউট। নাউ ইট ইজ ইয়োর টার্ন, ম্যান। আমি শুনতে চাই ভ্যান গগের চিত্রটির ব্যাখ্যা।’
চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করে আমি ঋজু পদক্ষেপে ফিরে আসি, ‘বোট’ শিরোনামের চিত্রকলার কাছে। আডেলিনা উৎসুক চোখে তাকালে আমি চিন্তাভাবনা করে তীর ছুড়ি, নৌকাগুলোর রেখাময় কাঠামোর দিকে ইশারা করে বলি, ‘পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট ধারায় জোর দেওয়া হয়, দৃশ্যের রৈখিক কাঠামোর ওপর। এ প্রকরণে বর্ণ ব্যবহৃত হয় অত্যন্ত জোরালো স্ট্রোকে, বর্ণ কিন্তু এখানে দৃশ্যকে রিপ্রেজেন্ট করছে না, বরং সয়ম্ভুভাবে তৈরি করছে রূপকল্প– যা আদতে প্রকাশ করছে চিত্রকরের নিজস্ব ইমোশনকে।’ কথা বলতে বলতে আমি একটু পজ নিলে সে অধৈর্য হয়ে জানতে চায়, ‘আই ক্যান ফলো হোয়াট ইউ সেড সো ফার, কিন্তু আমি ব্যাখ্যা চাই, বুঝতে চাই কেন ভ্যান গগ নদীর চর না এঁকে আঁকলেন হরেক বর্ণের নৌকাগুলো।’
আমি কনফিডেন্টলি জবাব দেই, ‘আনসার ইজ ভেরি ইজি। এ ধারার চিত্রকররা তাবৎ কিছু প্রকাশ করেন প্রতীকী পদ্ধতিতে। এখন দেখা যাক নৌকাগুলোর প্রতীকী তাৎপর্য কী? আমার ধারণা– পারে আটকে থাকা নৌকার প্রতীকে ভ্যান গগ গন্তব্যে পৌঁছতে না পারার বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করছেন। একটি নৌকায় এক নারী ছিপ ফেলেছে জলে, পাশের নৌকায় দাঁড়িয়ে দশাসই পুরুষের আকৃতি, স্পষ্টত সেও অপেক্ষা করছে কোনো কিছুর, আর অন্য নৌকায় বসা বিমর্ষ ভাবনায় নিমগ্ন নারী– কেবল প্রতীক্ষাই নয়, বরং চিত্রের বিমূর্ত ফিগারটি প্রতীক হয়ে উঠেছে তার অসুখী আত্মার। এবং অন্য নৌকাগুলোর যাত্রীহীনতা তাঁর সময়ের অন্তঃসারশূন্যতাকে প্রখট করে তুলছে।’
‘ওয়েল সেইড, ম্যান’, বলে তারিফের দৃষ্টিতে আডেলিনা আমার দিকে তাকায়। সে হাত বাড়িয়ে আমার রঙচঙে বাটিকের শার্টের কুঁচকানো ভাঁজ স্মুদ করে পার্স থেকে বের আনে একটি মেয়েলি হেয়ার ব্রাশ। তা বাতাসে এলোমেলো হয়ে আসা আমার চুলে চালিয়ে মৃদুস্বরে বলে, ‘ইউ লুক লাইক আ কালারফুল কাকাতুয়া টু-ডে।’
আমি তার রঙিন ঠোঁটের দিকে ইশারা করে ফিসফিসিয়ে বলি, ‘দে লুক স্ট্রবেরি-সুইট।’ ভ্রুকুটি করে নিমেষে তাতে পাউটি ভাব ফুটিয়ে তুলে সে বলে, ‘উই আর পাসিং থ্রু আ ভেরি সিনিক হিস্টোরিক্যাল প্লেস। চল, একসাথে দাঁড়িয়ে ভারননের ভুয়েক্স মোলিন নামে ভিলাটির দিকে তাকাই।’
আমরা পরস্পরের হাত ধরে, কয়েক কদম হেঁটে রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়াই। স্রোতজলে দাঁড়িয়ে আছে মধ্যযুগে তৈরি একটি ব্রিজের ভাঙারোঙা কয়েকটি খাম্বা। তাতে গজিয়েছে সবুজ গাছপালা ও ঝোপঝাড়। ব্রিজের খানিকটা অংশ এখনও টিকে আছে। তার শেষ প্রান্তে, নদীজলে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে মূলত কাঠ ও খানিকটা চুনসুরকিতে তৈরি একটি সুদর্শন ইমারত। হুইস্কির গ্লাস হাতে রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন মেমসাহেবটি। আডেলিনা কয়েকটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ফটোজেনিক অট্টালিকাটির দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘লুক অ্যাট দিস ম্যাগনিফিসেন্ট আর্কিটেকচার!’ মেমসাহেব অপস্রিয়মাণ দালানের দিকে গ্লাস তুলে ধরে বলেন, ‘আই অ্যাম সিম্পলি ক্যাপটিভেইটেড বাই ইটস চার্মস।’
তন্ময় হয়ে তাকিয়েছিলাম, সেইন নদীর বাঁকে, ক্রমশ আড়ালে চলে যাওয়া ভারননের ভুয়েক্স মোলিন নামের দৃষ্টিনন্দন ভিলাটির দিকে। হাত ছাড়িয়ে নেয় আডেলিনা। আমি ফিরে তাকালে, সে দৃষ্টিতে কেমন যেন ব্যাকুলতা ছড়িয়ে বলে, ‘আই রিয়েলি হ্যাভ টু গো। তোমাকে তো বলেছি আমার বিশেষ বন্ধু রেমন্ড মিলারের কথা। বেচারা একা একা বসে আছে নিচের কেবিনে।’
আমি জানতে চাই, ‘তাঁর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেবে না আডেলিনা?’ সে ক্যাবিনের সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলে, ‘আমি তাঁকে তোমার কথা বলেছি, নো নিড ফর অ্যান ইন্ট্রোডাকশন। সে আমার টেলিফোন-স্ক্রিনে তোমার ছবি দেখেছে। তুমি পরে নেমে এসে তাঁর সাথে কথা বলো, হি ইজ আ সুপার কুল গাই। সে পছন্দ করে বিপাসনা পদ্ধতির মেডিটেশন। তুমি এ প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁর সাথে আলাপ করতে পার। ও-কে, দেন।’
বোট ভারনন এলাকা ছেড়ে ভেসে যাচ্ছে শাখা নদী অইসির দিকে। আজকের এ নৌযাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে আমি গতকাল ইমপ্রেশনিজম নিয়ে রচিত কয়েকটি চটি বইপুস্তক ঘেঁটেছি। একটি তথ্য মাছের ঘাইয়ের মতো ঝিলিক পাড়ে স্মৃতিতে। চিত্রকর ক্লদ মোনে ঠিক এ জায়াগায় দাঁড়িয়ে ১৮৮৩ সালে এঁকেছিলেন, ‘হাউস অন দি ওল্ড ব্রিজ অ্যাট ভারনান’ নামে অসাধারণ একটি চিত্র। এর একটি রিপ্রিন্ট কেনা হয়নি বলে মনে একটু খেদও হয়। তখনই মনে হয়, এখান থেকে অনায়াসে চলে যাওয়া যায় জিবারনি বলে যে জায়গায় ক্লদ মোনে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ওয়াটার গার্ডেন। যেখানে জাপানি-কেতায় তৈরি বাঁকানো পুলের নিচে ফুটত গোলাপি শাপলা-শালুক। যা নিয়ে আঁকা চিত্রগুলোর কয়েকটি হালফিল শোভা পাচ্ছে, নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টসে। প্যারিসে আমার বসবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। দু-এক দিনের মধ্যে আমি রওনা হবো ইতালির ভিনতেমিলিয়া শহরের দিকে। জিবারনির ওয়াটার গার্ডেনে যাওয়ার সুযোগ আর হবে না ভেবে খিন্ন লাগে।
আমি হেঁটে ফিরে আসি বারের কাছে। ক্লদ মোনের ‘ইমপ্রেশন সানরাইজ’ চিত্রটির সামনে দাঁড়িয়ে আমি তাঁর কথা ভাবি। ফরাসি চিত্রকলার এ পুরোধা পুরুষ ভালোবাসতেন আউটডোরে কাজ করতে। নিসর্গে আলোর ক্রমাগত বিবর্তনের প্রতিচ্ছায়া তাঁর রেখায় ছড়াত মায়াবী বর্ণের ইন্দ্রজাল। তিনি ভুগতেন মারাত্মক ডিপ্রেশনে। ফাস্ট্রেটেড হয়ে তিনি ধ্বংসও করেন তাঁর অনেকগুলো চিত্র। আমি এ মুহূর্তের, আমার গভীর-গহনে বয়ে চলা জলজগুল্মে স্লথগতি ঝোরার মতো ফ্রাস্ট্রেশন নিয়ে প্রতিফলন করি। আমার ব্যর্থতা ও অপ্রাপ্তি কি তার চেয়েও প্রকট?
- বিষয় :
- গল্প