ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অধিকার

মীরা হাজরাদের মৃত্যু নিছক ‘দুর্ঘটনা’ নয়

মীরা হাজরাদের মৃত্যু নিছক ‘দুর্ঘটনা’ নয়
×

পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

চা বাগানে এখন পাতি তোলার মৌসুম। প্রতিদিনের মতোই কাজে গিয়েছিলেন মীরা হাজরা (৪০)। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের কাছে পর্যটনমুখর এক চা বাগান। সন্ধ্যার পরও ঘরে না ফেরায় খুঁজতে গিয়ে রাত ১০টার দিকে বাগানের একটি নালায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় শ্রীমঙ্গল থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

লাশের কাছে ২৫-৩০ কেজি ওজনের চা পাতাভর্তি কাপড়ের বোঝাটি পড়ে ছিল। মীরা হাজরার সারাদিনের নিরিখ। দিনে ২৪ কেজি চা পাতা তুললে এক নিরিখ হয়। এ জন্য দৈনিক মজুরি ১৮৭ টাকা। নিরিখের বেশি পাতা তোলা হলে কেজিপ্রতি বাড়তি মজুরি মেলে। তাই সবাই নিরিখের বেশি পাতা তুলতে চান। 

শ্রীমঙ্গল থানার ডিউটি অফিসারের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানায়, চা পাতা সংগ্রহের এক পর্যায়ে মীরা নালায় পড়ে যান। চা পাতার বোঝা তাঁর ওপর পড়ায় আর উঠতে পারেননি। মীরা হাজরার লাশের ময়নাতদন্ত হয়নি। পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর হয়েছে।

এ ধরনের ঝুঁকি আকস্মিক নয়। উঁচু টিলাভূমির চা বাগানের নালা-খন্দ খুব সরু হয় এবং আপাত গভীর। ওপর থেকে নিচে কেউ পড়ে গেলে সুস্থভাবে ওঠা কঠিন। মীরা হাজরার করুণ মৃত্যু আবারও আমাদের সামনে চা বাগানের কঠিন পরিবেশকে সামনে আনল। মাঝে মাঝে এভাবে নালা-খন্দেই জীবন যায় চা শ্রমিকের।

চা পানে অভ্যস্ত বাংলাদেশ মীরা হাজরার মৃত্যুকে কীভাবে পাঠ করবে? দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা; ন্যূনতম মজুরি বোর্ড প্রণীত ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল; বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বি-৭৭) নির্বাচন এবং চা বাগানিদের ভূমির বন্দোবস্তি– এই চার দফা দাবিতে আন্দোলন চলছে চা বাগানে। মীরা হাজরা যেদিন মারা যান, সেদিন সকালেও আন্দোলনরত চা শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা হয়। চা শ্রমিক নেতা গীতা রানী কানুসহ অনেকেই আহত হন। অন্যায়ভাবে গীতা রানী কানুকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

চা বাগানের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও বিবেচনাযোগ্য। দূষিত পানি পান করে ডায়রিয়ায় মৃত্যু যেন সাধারণ নিয়ম। ২০০৭ সালে প্রায় ৪০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল বিভিন্ন চা বাগানে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চাম্পারায় চা বাগানের চাম্পা মুসহর, মানকুমারী কর্মকার, সচী কর্মকার, পূর্ণিমা কর্মকারদের মৃত্যু ঘটেছিল তখন। 
দেখা গেছে, বেশির ভাগ চা বাগানে শ্রমিকদের কারও জটিল অসুস্থতাতেও কর্তৃপক্ষ তাদের চিকিৎসায় এগিয়ে আসে না। করোনা অতিমারির সময় দেশ-দুনিয়া লকডাউন হলেও একমাত্র শিল্প খাত হিসেবে চা বাগান খোলা ছিল। করোনার সংক্রমণ ও বিস্তার বাড়তে থাকলে নানা রাষ্ট্রীয় বিধি ও সুরক্ষা ঘোষণা আসে। কিন্তু মহামারির মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে চা শ্রমিকরা বাংলাদেশের মানুষের পেয়ালায় গরম চা সরবরাহ করেছিলেন। আমরা সেসব অবদান কোনোদিন মনে রাখিনি। এ কারণে আমাদের জন্য চা পাতা তুলতে গিয়ে বাগানের নিরাপত্তাহীনতার কারণে চা পাতার বস্তার তলায় চাপা পড়ে মীরা হাজরাদের মৃত্যু হলেও আমাদের কিছু যায় আসে না। কারণ আমাদের পেয়ালা আশ্চর্য রকম গরম চায়ের কড়া লিকারে ভরপুর হয়ে যায়। 

এটাও ভুলে যাওয়া কঠিন, করোনা মহামারির প্রথম ঢেউয়ে ২৫ মার্চের আগে গণপরিবহন ও পর্যটনে নিষেধাজ্ঞা আসার আগ পর্যন্ত চা বাগানগুলোতে উপচে পড়া ভিড় ছিল পর্যটকের। চা বাগান বন্ধ না করে নিদারুণভাবে বাংলাদেশ চা বোর্ড ৬ এপ্রিল ২০২০ তারিখে ওয়েবসাইটে ‘চা বাগানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ভিডিও’ নামে প্রায় ৩ মিনিটের একটি ভিডিও আপলোড করে দায় সেরেছিল। তবুও এক শিশু মারা গিয়েছিল এবং পরীক্ষায় তার করোনা পজিটিভ এসেছিল। শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানের মন্টু তাঁতির করোনা শনাক্ত হয়েছিল ২১ এপ্রিল ২০২১। অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য একটা অ্যাম্বুলেন্স চেয়েও পাওয়া যায়নি। পরে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে এনে তাঁকে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মন্টু তাঁতি মারা যান।
কাজের চাপ, স্বল্প মজুরি, অনাহার, অপুষ্টি, অসুখ, বাগানের অব্যবস্থাপনা, ভূমিহীনতা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, বাগানে ব্যবহৃত বিপজ্জনক কীটনাশক, চিকিৎসার অভাবসহ নানামুখী কারণ চা বাগানের শ্রমিকদের বিগত মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আর এসব কিছুর পেছনে আছে কাঠামোগত বৈষম্য।

মীরা হাজরার মৃত্যু তাই কোনো নিছক ‘দুর্ঘটনা’ নয়। এটি করুণ কাঠামোগত ফলাফল। আমাদের সবাইকে এই মৃত্যুর দায় নিতে হবে। 

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×