ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাংগঠনিক বিভক্তি, নেত্রী গ্রেপ্তারে উত্তেজনা

সাংগঠনিক বিভক্তি, নেত্রী গ্রেপ্তারে উত্তেজনা
×

মৌলভীবাজার আদালতপাড়া থেকে বুধবার গীতা রানীকে পুলিশের তুলে নেওয়ার মুহূর্ত সংগৃহীত

 নূরুল ইসলাম, মৌলভীবাজার

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি বছরের জুলাই-আগাস্টজুড়ে চা বাগানগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এসব ক্ষেত্রে চা শ্রমিক নেতাদের ভূমিকা নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা।
ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পালের বক্তব্যে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। হাইকোর্টে রিট-সংক্রান্ত জটিলতা শেষ হয়েছে। এখন আর নির্বাচন আয়োজনে কোনো সমস্যা নাই। নির্বাচন কমিশন গঠন করে তপশিল ঘোষণার লক্ষ্যে প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন নিয়ে গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে। দীর্ঘ দিন পর নেতৃত্বে যাওয়ার সুযোগ লুফে নিতে মরিয়া নেতা ও তাদের অনুসারীরা আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছেন। এ পরিস্থিতে শ্রমিক অসন্তোষ ও দাবি আদায়ের কার্যক্রম বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এমন আবহে পট পরিবর্তনের আভাস মিলছে বাগানগুলোতে।
চা-বাগান অধ্যুষিত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে; যার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের শ্রমিক অসন্তোষ, নেতৃত্বের সংকট ও মজুরি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশে চলছে লাগাতার কর্মসূচি। একদিকে শ্রমিকদের এসব কর্মসূচিতে চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিতি যেমন নেতৃত্ব সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে; অন্যদিকে একাধিক নেতৃত্বকে ঘিরে দৃশ্যমান হচ্ছে শ্রমিক বিভক্তি।
সাধারণ শ্রমিকরা বলছেন, তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে লাগাতার কর্মসূচিতে যখন কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে ঠিক সে সময় এমন বিভক্তি উদ্বেগের।
চা শ্রমিকদের মজুরি, নির্বাচনসহ বিভিন্ন অধিকার আদায়কেন্দ্রিক বিষয় নিয়ে মৌলভীবাজারে চা শ্রমিক ইউনিয়ন স্পষ্টত দু’ভাগে বিভক্ত হয়েছে। ফলে শ্রীমঙ্গল লেবার হাউসে সাম্প্রতিক মারামারির ঘটনায় থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও মামলা দায়ের করেছে দুটি পক্ষ। এ নিয়ে বাগানগুলোতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

জানা যায়, সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক জনক লাল দেশোয়ারার নেতৃত্বে গত সোমবার দুপুরে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের শিগগির ব্যবস্থাসহ তিন দফা দাবি আদায়ে সাধারণ চা শ্রমিক, ছাত্র-যুবকদের উদ্যোগে শ্রীমঙ্গল পয়েন্টে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এরপর ওইদিন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীর কাছে এসব দাবিসংবলিত স্মারকলিপি ডিডিএল অফিসের কর্মকর্তার মাধ্যমে পাঠানোর জন্য তারা মিছিল সহকারে লেবার হাউসে যান।
এ বিষয়ে চা শ্রমিক নারী ফোরামের আহ্বায়ক গীতা রানী কানুর অভিযোগে, সেখানে মিছিল নিয়ে যাওয়া জনক লাল ও তাঁর সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীসহ অন্যদের ওপর ইউনিয়নের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পালের নেতৃত্বে একদল লোক হামলা চালায়। তারা মিছিলকারীদের ব্যানার কেড়ে নেয়। হামলায় জনক লাল দেশোয়ারাসহ তিনজন আহত হন।
চা শ্রমিক নেত্রী গীতা রানী কানু জানান, সাধারণ শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেবার হাউসে শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে যাওয়ার পর সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা চালানোর বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। এ বিষয়ে আক্রান্তরা শ্রীমঙ্গল থানায় গিয়ে মামলার অভিযোগ দিলে পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো আমাদের পাঁচজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ।

চা শ্রমিক নেতাদের একাংশের দাবি, শ্রমিকদের চাঁদার টাকা খেয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা ৪ বছর ধরে বাগান মালিক ও শ্রমিক বৈঠক করে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন নেতারা সাধারণ শ্রমিকদের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে মালিকপক্ষের স্বার্থ হাসিল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
অন্যদিকে চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল অভিযোগ করেন, ১০ থেকে ১৫ জনের একটি বিশৃঙ্খলাকারী দল মিছিল নিয়ে এসে গালাগাল করে লেবার হাউসের দরজা-জানালাসহ আসবাব ভাঙচুর করে। তখন অফিসে থাকা মানুষের জানমালের হেফাজতে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের প্রতিহতের চেষ্টা করা হয়। তিনি আরও জানান, লেবার হাউসে ভাঙচুরের ঘটনায় গীতা রানীসহ পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।

চা শ্রমিক নেত্রী গীতা রানী কানু গত বুধবার মৌলভীবাজার আদালতে আত্মসমপর্ণ করতে গেলে তাঁকে আদালতপাড়া থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে সন্ধ্যার দিকে মৌলভীবাজার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে গত সোমবার শ্রীমঙ্গল লেবার হাউসের সামনে সংঘর্ষে আহত জনক লালসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার আতঙ্কে হাসপাতাল থেকে আত্মগোপনে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে চা শ্রমিকদের মাঝে আতঙ্কের পাশাপাশি চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সামাজিক মাধ্যমে চা শ্রমিক নেত্রীর মুক্তির দাবিতে সরব রয়েছেন অনেকে।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কমলগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরী বলেন, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি শ্রমিক ঐক্য ও সহাবস্থানের পরিপন্থি। চা শ্রমিকদের কোনো অংশ ভিন্নমত পোষণ করলে সাংঠনিকভাবে বসে সমাধান করা উচিত ছিল। তিনি জানান, গীতা রানী কানু ছাড়া মামলার অপর চার আসামি আদালতে আত্মসমপর্ণ করে জামিন পেয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে নিপেন পাল বলেন, চা শ্রমিকদের মজুরি দৈনিক ৫০০ টাকা দাবির আড়ালে একটি চক্র বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। সাধারণ চা শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চাচ্ছে। তাদের এই চক্রান্তকে কোনো অবস্থাতেই সফল হতে দেওয়া হবে না।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের এই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২০২২ সালে শ্রমিকদের মজুরি ১২০ থেকে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়েছিল। তখন মালিকপক্ষ থেকে বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার বিষয়টি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। ২০২৩ সাল থেকে শ্রমিকদের মজুরি প্রতি বছর ৫% হারে বাড়ছে। চা শ্রমিক ইউনিয়ন তিন বছর পরপর মালিক-শ্রমিক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের পক্ষে কাজ করছে। মামলাসংক্রান্ত জটিলতার অবসান হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠন করে গঠনতান্ত্রিকভাবে যথাসময়ে তপশিল ঘোষণা এবং নির্ধারিত তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া চলছে।

চা শ্রমিক নেতা মোহন রবিদাস সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, শ্রীমঙ্গল লেবার হাউস সাধারণ শ্রমিকের টাকায় প্রতিষ্ঠিত, কারও বাপ-দাদার টাকায় হয়নি। সেখানে সাধারণ শ্রমিক, চা শ্রমিকের সন্তান, ছাত্র, যুবক সকলের যাওয়ার অধিকার আছে। সেখানে সাধারণ শ্রমিকরা যাওয়ার পর নৃশংস হামলার ঘটনার নিন্দা জানান তিনি।
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, লেবার হাউসে মামলা করে ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। অপর পক্ষ অভিযোগ দিলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×