ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে পাকিস্তান

ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে পাকিস্তান
×

মালিহা লোধি

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পাকিস্তানের মতো এত বেশি প্রতিকূলতার মুখোমুখি খুব কম দেশকেই হতে হয়েছে। পূর্ব পাশে এক প্রভাবশালী ও শত্রুতামূলক প্রতিবেশী; ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া বিতর্কিত সীমানা; অমীমাংসিত কাশ্মীর বিরোধ; অস্থিতিশীল পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও সংঘাত এবং বিদেশি হস্তক্ষেপে জর্জরিত পশ্চিম প্রতিবেশী– সব মিলিয়ে দেশটিতে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে রেখেছে। এই সংকটের কারণেই মূলত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সমস্যা হলো একসঙ্গে দুটি ‘উত্তপ্ত সীমান্ত’ মোকাবিলা করা। এই পরিস্থিতি এড়ানোর তাগিদ থেকেই দেশটির কৌশলগত চিন্তাভাবনা, নিরাপত্তা নীতি ও রণকৌশল তৈরি হয়েছে।  

ভৌগোলিক অবস্থানের এই নির্মম বাস্তবতা সব সময়ই দেশটির ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। যা বদলেছে তা হলো এই হুমকির পরিধি ও গুরুত্ব। পাকিস্তান এখন এক ত্রিমুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যেমন– পূর্ব সীমান্তে ভারত, আফগানিস্তান থেকে আসা আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলা এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতা। 
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক– পাকিস্তানের দুটি প্রদেশ আগে কখনও একসঙ্গে এতটা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি। অতীতে দুটি প্রদেশেই সহিংসতা দেখা গেছে; তা ছিল নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ; পুরো প্রদেশজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়েনি। এর আগে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে কখনও এমন সহিংস গণবিক্ষোভ দেখা যায়নি, যা আজ প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। বলপ্রয়োগ ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে কেবল আরও অবনতিই করেছে।

খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) ও বেলুচিস্তানে উগ্রপন্থি হামলার তীব্রতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই খাইবার পাখতুনখোয়ায় মূলত নিষিদ্ধ সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর মাধ্যমে ২০০টির বেশি সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে। এতে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়। হামলার বিস্তার ঘটায় এই নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সময়ে বেলুচিস্তানে প্রধানত বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) মাধ্যমে ১০০টির বেশি হামলা হয়েছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী উগ্রপন্থি গোষ্ঠী তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিচিত্র কিছু হামলার নিশানা বানিয়েছে। তাদের হামলার তালিকায় রয়েছে রেললাইন, গ্যাস পাইপলাইন, সরকারি ভবন ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প থেকে শুরু করে অ-বেলুচ সাধারণ বাসিন্দারাও। এদিকে বেলুচিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত অঞ্চলে টিটিপির ক্রমবর্ধমান হামলা প্রমাণ করে, তাদের অভিযানের ক্ষেত্র খাইবার পাখতুনখোয়ার বাইরেও অনেক দূর বিস্তৃত। যেমন সম্প্রতি রেঞ্জার্স সদরদপ্তরে হওয়া হামলা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, এমনকি তাদের হামলার গণ্ডি করাচি পর্যন্ত পৌঁছেছে।  

কয়েক দশক ধরে ক্রমাগত বাড়তে থাকা এই নিরাপত্তা সংকট থেকে পাকিস্তানকে প্রধানত ‘নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে বাধ্য করেছে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সেবা, গণতন্ত্র ও অন্যান্য নীতিমালার চেয়ে প্রতিরক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ত্যাগ স্বীকারের পরও দেশটিকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। উত্তপ্ত সীমান্ত থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে চলমান বিদ্রোহ– পাকিস্তানের নিরাপত্তার হুমকির পরিধি কেবল বেড়েই চলেছে।

মালিহা লোদী: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত; দ্য ডন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×