আইনের সংশোধনেও হলো না ক্ষতিপূরণের বিহীত
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহত শ্রমিকদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। বড় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের জোর দাবি শোনা যায় শ্রমিক সংগঠন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। কিছু ক্ষেত্রে আহত শ্রমিক চিকিৎসা ও নিহত শ্রমিক পরিবার কারও কারও পক্ষে চিকিৎসা ও নামকাওয়াস্তে ক্ষতিপূরণ মিলে। যাদের পক্ষে তৎপর হওয়ার কেউ নেই তাদের দাবি একপর্যায়ে চোখের জলেই মিলিয়ে যায়। মানবেতর জীবনই তখন কেবল সঙ্গী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় আইনে হতাহতদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য নয় মালিক কর্তৃপক্ষ। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ মাত্র দুই লাখ টাকা, যা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়। শিল্প মালিককে এ জন্য কোনো দায় নিতে হয় না। এই সুযোগকে দুর্ঘটনা থেকে সুরক্ষায় বিনিয়োগকে অর্থহীন মনে করেন তারা। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা অন্যান্য শিল্প খাতে কাজে লাগানো হয়নি। এমনি ওই দুর্ঘটনার পর তৈরি পোশাক খাতে নিরাপদ কর্মপরিবেশের যে সফল উদাহরণ তৈরি হয়েছে, তা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি দেশের অন্যান্য শিল্প খাত। এ কারণে এরপরেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকেরা কাঙ্ক্ষিত মাণদণ্ডে ক্ষতিপূরণ পাননি। অনেক দুর্ঘটনার পরে মামলা নেওয়া হয়নি। দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসাসেবা পাননি আহত শ্রমিকেরা।
এরকম বাস্তবতা সত্ত্বেও সংশোধিত শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ কয়েক দফায় সংশোধন করা হয়। কোনো বারই ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। সর্বশেষ গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইনেও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। এতে ক্ষতিপূরণ অংশে বলা হয়, সরকার বিধি দ্বারা উপযুক্ত বিবেচিত কোনো কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রতিষ্ঠা করবে। ওই বিধিতে তহবিলের ব্যবস্থাপনা বোর্ডের গঠন, কার্যাবলি, প্রদেয় সুবিধার প্রকার ও মাত্রা নির্ধারণ, তহবিলের অর্থায়ন উৎস ও পদ্ধতি এবং তহবিলের কার্যকর প্রশাসন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া কোন কোন শিল্প খাত এই আইনে প্রযোজ্য হবে সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করবে।
জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, শ্রম আইন সংশোধনীতে ক্ষতিপূরণের মতো মৌলিক দাবির বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। ক্ষতিপূরণের একটি স্থায়ী মানদণ্ড নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল কমিশনের পক্ষ থেকে। এজন্য আইএলওর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ অনুসরণের কথা বলা হয়। কিন্তু এ সব সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। বরং মালিকদের জন্য সুবিধাজনক হয়–এমন কিছু করা হয়েছে। সরকার, মালিক ও শ্রমিক ত্রিপক্ষীয় সুপারিশকে পাশ কাটিয়ে সংসদে বিল পাসের আগে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত।
ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে শ্রমিকনেতা তৌহিদুর রহমান সমকালকে বলেন, শিল্প খাতে বড় ওই দুর্ঘটনার এক যুগ পরে এসেও ক্ষতিপূরণে কোনো কূলকিনারা হয়নি। এরপরেও নারায়ণগঞ্জে হাশেম ফুডের সেজান জুস কারখানা কিংবা টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার অগ্নি-দুর্ঘটনাসহ ছোট-বড় অনেক শিল্প-দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু হতাহতদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের স্থায়ী কোনো নীতিমালা হয়নি।
আইএলওর এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি বেনেফিটস কনভেনশন ১৯৬৪-এর সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হলে তাঁর আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমান আর্থিক সুবিধা দিতে হবে তাঁর পরিবারকে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর হাইকোর্ট স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করা শ্রমিকদের ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছিল। এ ছাড়া একটি অঙ্গ হারানো শ্রমিকদের সাড়ে সাত লাখ টাকা, দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসার প্রয়োজন এমন শ্রমিকদের সাড়ে চার লাখ টাকা এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এর বিপরীতে বাংলাদেশ শ্রম আইনে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ মাত্র ২ লাখ টাকা। বাস্তবতা হচ্ছে এ আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণও পায়নি রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকদের অনেকের পরিবার।
ট্রাস্ট এখন অর্থ সংকটে
ট্রাস্ট ফর ইনজুরড ওয়ার্কার্স মেডিকেল কেয়ার (টিআইডব্লিউএমসি) নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয় ২০১৬ সালে। আইএলওর নেতৃত্বে ব্র্যান্ড-ক্রেতা ও অন্য বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা ট্রাস্ট তহবিল থেকে এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু ট্রাস্ট এখন অর্থ সংকটে। চিকিৎসা সহায়তার আবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় ফান্ডে ২৫ কোটি টাকার এককালীন সহায়তা দিতে গত অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ জানান। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে ২২ দিন সুপারিশের ফাইলটি পড়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত ফাইলে সই করেননি প্রধান উপদেষ্টা।
ট্রাস্টের সমন্বয়ক শাহরিয়ার রনি গতকাল সমকালকে জানান, তহবিলের কিছু অর্থ নিয়ে টিআইডব্লিউএমসির মাধ্যমে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে অর্থ সংকটে শ্রমিকদের উন্নত চিকিৎসার আবেদনে যথাযথ সাড়া দিতে পারছেন না তারা।
- বিষয় :
- ক্ষতিপূরণ
