আবার ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে: সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ
সংসদে হাসনাত আব্দুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১৭ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৪৪
দেশে আবার একটা ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে সংসদে মন্তব্য করেছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় মূখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ)। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে চাই। আমরা নির্ভয়ে ফেসবুকে লিখতে চাই, আমরা ব্যাকস্পেস ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু আবার একটা ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
আজ রোববার সংসদের বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে, বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আজকে আমরা সংসদে সবার কাছে অনেকের সংগ্রামের কথা শুনি, তারা অনেক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আজকে সংসদে এসেছেন। আসলে আমাদের প্রজন্মের জন্য আপনারা যে কাজগুলো করছেন, যে দায়িত্বটা নিয়েছেন, এই দায়িত্বের ফলভোগী বা সুবিধাভোগী কিন্তু আমরা, আমাদের এই প্রজন্ম।’
হাসনাত বলেন, 'আমরা খুব আশাহত হই; যখন দেখি এত রক্ত, এত লড়াই, এত ত্যাগের পরে গঠিত এই সংসদ আবার আগের সেই দোষারোপের সাইকেলে ফিরে যাচ্ছে। বিরোধী মত দমনের নামে মামলার যে সাইকেল, আমরা সেখানে আবার চলে গিয়েছি। ক্যাম্পাসগুলো আবার অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে।'
বিরোধী দল ও মত দমনের অভিযোগ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, 'বিরোধী দল ও মত দমনে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে লেখার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে, সমালোচনা করলে তুলে আনা হচ্ছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্টুন শেয়ার করে বিভিন্ন স্যাটায়ার বা মকারিকে (উপহাস) প্রমোট করছেন, সেখানে এই সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৯টি এমন ঘটনা ঘটেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আগেও ছিল, আওয়ামী লীগের সময় ছিল—তবে সেটা ছিল কেবল সহমত প্রকাশের স্বাধীনতা। আমরা এই সংসদে কাছে কেবল মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, বরং দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই।'
হাসনাত বলেন, 'আমরা দেখলাম, সিলেক্টিভ এক ধরনের বিরোধিতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের সমাজের যারা পলিটিক্যালি এলিট শ্রেণির নারী, তাদেরকে নিয়ে সমালোচনা করা হলে সেটাকে নারী বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়; কিন্তু গার্মেন্ট কর্মী বা গ্রামগঞ্জের মায়েরা যারা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রাতদিন পরিশ্রম করছেন, তাদেরকে যখন গালি দেওয়া হয়- সেটাকে আমরা আমলে নেই না। এ ধরনের সিলেক্টিভ জায়গাগুলো থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।'
বিরোধী দলীয় এই সদস্য বলেন, ''ক্যাম্পাসগুলোতে আবার অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে। ২০২২ সালে ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ কালচার ছিল। ক্ষমতাসীন দল শিক্ষার্থীদের পুঁজি করে তাদের ক্ষমতা কাঠামো দীর্ঘমেয়াদী করার জন্য বাধ্যতামূলক রাজনীতি করাত। আজকে সেখানে আবার সেই কালচার চালু করার প্রয়াস শুরু হয়েছে।''
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাসীনরা তাদের সন্তানদের বিদেশে রেখে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে, আর মধ্যবিত্ত বা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সন্তানদের ব্যবহার করে তাদের ক্যারিয়ার নষ্ট করে নিজেদের গদি শক্ত করে। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন চান তিনি।
এনসিপির এই সদস্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল নেতা তৈরির হাতিয়ার হবে না, এগুলো হবে গবেষণা ও পাঠ চর্চার কেন্দ্র। যেখান থেকে জাতিকে বুদ্ধিজীবী ও গবেষক উপহার দেওয়া যাবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল নেতা উৎপাদনের সার্কেলে পরিণত হয়েছে। এই ৩৬শে জুলাই তরুণ প্রজন্মকে কী দিয়েছে? ১৭ বছর ধরে যারা নির্যাতিত হয়েছে, তাদের কিছুই দিতে পারিনি। অথচ আমরা একটা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছিলাম।
হাসনাত আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের অর্ডিন্যান্স বাতিল করে বলা হচ্ছে পুনর্বিবেচনা করা হবে। যদি নিয়ত সঠিক থাকতো (ওয়েল ইনটেনশন থাকতো), তবে এই অর্ডিন্যান্স গ্রহণ করে পরবর্তীতেও সংশোধন করা যেত।
সরকারি দল ও বিরোধী দলকে প্রজন্মের ভাষা অনুধাবনের আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী দল একটি আপেক্ষিক বিষয়। সরকারি দল এক সময় এপাশে ছিল, এখন ওপাশে গিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সন্তান যে প্রজন্মের, আমরাও সেই একই প্রজন্মের। কেবল বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি নয়, বরং মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে। এই সংসদে এসি রুমে বসে, এসি গাড়িতে চলে বা ঢাকার ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের মধ্যে থেকে জনগণের সমস্যা বোঝা যায় না। লোডশেডিং বা বড় সমস্যাগুলো এখানে পাওয়া যাবে না।
বিভাজনের রাজনীতি না করার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আবার বিভাজনের রাজনীতিতে ফিরে গেলে কোনো রাজনৈতিক দল নয়; বরং জুলাইতে যাদের পরাজিত হয়েছে তারাই লাভবান হবে।
- বিষয় :
- এনসিপি
- হাসনাত আব্দুল্লাহ
