প্রয়াণ
তাঁর ছবি ইতিহাসের অনন্য সাক্ষ্য
রঘু রাই
শিলু হোসেন
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:০৪ | আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৩৭
১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়। চারদিকে গোলাগুলির শব্দ, লাশের স্তূপ; স্বজনহারা, বাড়িঘরছাড়া ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারি। একটু আশ্রয়ের জন্য আতঙ্ক নিয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছেন নারী-শিশু-বৃদ্ধ। ভয়াবহ এই সময়ে ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লেন এক বিদেশি যুবক। তিনি কখনও ঘুরছেন মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে, কখনও ছুটে যাচ্ছেন শরণার্থী শিবিরে। ক্যামেরার লেন্সে একের পর এক ধরতে থাকেন যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের অস্থিরতা, দুঃখ-দুর্দশা ও অমানবিকতার করুণ সব দৃশ্য।
তাঁর তোলা ছবিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মূল্যবান দলিল। এসব দৃশ্য ধারণ করা ব্যক্তির নাম রঘু রাই; পুরো নাম রঘুনাথ রাই চৌধুরী। ভারতের প্রখ্যাত এই আলোকচিত্রী গতকাল রোববার প্রয়াত হয়েছেন। এদিন নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
রঘু রাইয়ের ছেলে আলোকচিত্রী নীতিন রাই জানান, দুই বছর ধরে প্রোস্টেট ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি। বয়সজনিত নানান জটিলতাও ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্ধ্যায় নয়াদিল্লির লোধি রোড শ্মশানে রঘু রাইয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
রঘু রাইয়ের সমৃদ্ধ কর্মজীবন অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত ছিল। তাঁর জন্ম ১৯৪২ সালে, অবিভক্ত ভারতের জাং (এখন পাকিস্তানের অংশ) শহরে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে তাঁর নতুন ঠিকানা হয় ভারত।
পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার) বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন রঘু রাই। কিন্তু এতে তাঁর মন টেকেনি। তিনি ক্যামেরাকে বেছে নেন জীবনের মূলধারা হিসেবে। ১৯৬৫ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বড় ভাই এস পলের অনুপ্রেরণায় তাঁর ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু। ১৯৬৬ সালে আলোকচিত্রী সাংবাদিক হিসেবে দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় যোগ দেন। সেখানে কাজ করেছেন ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দি স্টেটসম্যানের প্রধান আলোকচিত্রী ছিলেন তিনি। সেই যুদ্ধের স্মৃতিচারণায় রঘু রাই বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের আগস্টে কলকাতা থেকে সম্পাদক আমাকে ফোন করে বললেন, হাজার হাজার শরণার্থী দীর্ঘ লাইন ধরে ভারতে ঢুকছে। তাদের ছবি তোলার জন্য কলকাতায় আসতে হবে। সম্পাদকের ডাকে কলকাতায় নেমে সোজা চলে গেলাম যশোর-খুলনা রোডের দিকে।’
রঘু রাই জানান, তখন বর্ষাকাল; তুমুল বৃষ্টি। সীমান্তের তিন-চার কিলোমিটার দূর থেকে দেখি, হাজার হাজার মানুষ হাঁটছে– শিশু, বৃদ্ধ নানান বয়সী তারা। লোক আসছে সাইকেলে, গরুর গাড়িতে; বেশির ভাগই হেঁটে। সবারই এক সমস্যা– উদ্বাস্তু। বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। সেই তারা হেঁটেই চলেছে।
এই দৃশ্য রঘু রাইয়ের চার বছর বয়সের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। তিনি বলেছিলেন, ‘লাহোরের ১০০ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তানের জং থেকে আমরা এসেছিলাম। শরণার্থী শিবিরের উদ্দেশে আমরাও এভাবে অবিরাম হাঁটছিলাম। তাই সঙ্গে সঙ্গে তাদের কষ্টের সঙ্গে আমি একাত্ম হয়ে পড়ি।’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন স্থান ঘুরেছেন রঘু রাই। দেখেছেন ভয়াবহ সব দৃশ্য। সেগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে ভোলেননি। লাখ লাখ মানুষ। কারও থাকার জায়গা নেই। স্কুলসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছে বড় সিমেন্টের পাইপের ভেতর। সেখানেই চলছে রান্না, খাওয়া। রঘুর ক্যামেরায় তোলা এসব উদ্বাস্তুর দুর্বিষহ কষ্টের দৃশ্য আজও বাংলাদেশের মানুষের চোখ ভিজিয়ে দেয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের দৃশ্য, বিজয়ের পর তাদের দেশে ফেরা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তও রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এসব ছবি যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অমূল্য দলিল, তেমনি সেগুলো ব্যক্তিগতভাবে রঘু রাইকে আলোকচিত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ পদক দেয়। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, শরণার্থীদের দুর্দশা এবং পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের চিত্র তুলে ধরার জন্য এই স্বীকৃতি পান তিনি।
বিভিন্ন জায়গা কাজ করেছেন রঘু রাই। এক জীবনে তুলেছেন বিচিত্র বিষয়ের ছবি। তবে তিনি কেবল ছবিই তোলেননি, মানুষ আর সময়ের গল্প গ্রন্থিত করেছেন ইতিহাসের পাতায়।
রঘু রাই কলকাতার সাপ্তাহিক ‘সানডে’ ম্যাগাজিনের পিকচার এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় নিউজ ম্যাগাজিন ‘ইন্ডিয়া টুডে’র পিকচার এডিটর হিসেবে কাজ করেন ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফটোগ্রাফিক সংগঠন ‘ম্যাগনাম ফটোজ’-এর সদস্য তিনি।
রঘু রাই ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগে তিনি নয়াদিল্লিতে বসবাস করছিলেন। কাজ করছিলেন নিজের ৫৭তম বই নিয়ে। তাঁর মৃত্যুতে আলোকচিত্র জগতে একটি যুগের অবসান ঘটল।
- বিষয় :
- মুক্তিযুদ্ধ
- আলোকচিত্র
- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
