ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নতুন শর্তে সমুদ্রের ২৬ ব্লকে উন্মুক্ত দরপত্রের প্রস্তুতি

অনুমোদন মিললে ১৫ মের মধ্যে দরপত্র

নতুন শর্তে সমুদ্রের ২৬ ব্লকে উন্মুক্ত দরপত্রের প্রস্তুতি
×

ফাইল ছবি-সংগৃহীত

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৯:১৬ | আপডেট: ০১ মে ২০২৬ | ০৯:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি আমদানি-নির্ভরতা কমাতে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সংশোধিত আর্থিক ও চুক্তিগত শর্তে ২৬টি অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে আগামী মাসেই দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে ১৫ মের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করতে পারে পেট্রোবাংলা।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আপত্তি বিবেচনা করে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন ব্যয় পুনরুদ্ধার এবং কাজের বাধ্যবাধকতার শর্তে সংশোধন এনে নতুন ‘মডেল প্রডাকশন শেয়ারিং চুক্তি’ (পিএসসি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, গ্যাসের মূল্য এখন আন্তর্জাতিক বাজারদর বা ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং প্রতি পাঁচ বছর পর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তা সমন্বয় করা হবে।

নতুন শর্তানুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া ব্লকের ২০ শতাংশ ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাইপলাইন ট্যারিফ টেন্ডার জয়ী কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে, তবে অবকাঠামো ব্যয় পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের সুযোগ বহাল থাকছে।

গ্যাসের মূল্য নির্ধারণেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের পাঁচ বছরের গড় দামের ১১ শতাংশ হারে নির্ধারিত হবে, যেখানে তেলের দামের ন্যূনতম ৭০ এবং সর্বোচ্চ ১০০ ডলার সীমা থাকবে। অগভীর সমুদ্রে এ হার ১০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। 

বারবার ব্যর্থ দরপত্র
বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক। ২০১০ সালে ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে চারটি বিদেশি কোম্পানি কাজ শুরু করলেও কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগেই তারা ব্লকগুলো ছেড়ে দেয়। 

২০১৬ সালে শেষবার দরপত্র ডাকা হলেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখায়নি। এরপর ২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হলেও দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। পরে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের মডেল পিএসসি তৈরি করা হয়। 

নতুন মডেল পিএসসি  অনুযায়ী, অগভীর সমুদ্রে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫.৬০ ডলার এবং গভীর সমুদ্রের জন্য ৭.২৬ ডলার। সম্পদ উত্তোলনে বাংলাদেশের অংশের হিস্যা বা মালিকানার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়। অগভীর সমুদ্রে নতুন মডেলে বাংলাদেশের হিস্যা করা হয় ৪০-৬৫ শতাংশ, যা আগে ছিল ৫০-৮০ শতাংশ। গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের হিস্যা ৩৫-৬০ শতাংশ করা হয়, যা আগে ছিল ৫০-৭৫ শতাংশ। প্রয়োজনীয় শর্তসাপেক্ষে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও রাখা হয়। এটাকে ভিত্তি ধরে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। সেই সময় ৫৫টি কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত কেউ দরপত্র জমা দেয়নি।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলো অনাগ্রহী ছিল।

স্থলভাগেও ২১ ব্লকে দরপত্র
অফশোরের পাশাপাশি স্থলভাগে ২১টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। তবে পার্বত্য এলাকার ২২এ ও ২২বি ব্লক এর বাইরে থাকবে। বর্তমানে আইওসি শেভরন প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস ৩৩৯ টাকা এবং টাল্লো ২৮৪ টাকায় বিক্রি করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ তুলনামূলক অনেক কম।

এলএনজিনির্ভরতা ঊর্ধ্বমুখী
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি আমদানি থেকে আসে ৮৫-১০০ কোটি ঘনফুট। ২০৩০ সালে চাহিদা বেড়ে ৬৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, দেশের জ্বালানির প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। তাই দেশে দ্রুত অনুসন্ধান শুরুর পরামর্শ দেন।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট মজুত ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।

আরও পড়ুন

×