মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগ
গবেষণায় উঠে এলো মুক্তিযুদ্ধে স্বামী হারানো ১৩০ নারীর জীবনসংগ্রামের চিত্র
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ২০:০৪ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ২১:৩৩
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে উপার্জনক্ষম পরিবারপ্রধানকে হারিয়েছিলেন বিপুল সংখ্যক শহীদ জায়া। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এই নারীদেরই সুকঠিন জীবনসংগ্রামে নামতে হয়েছিল। তাদের অনেকেই সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করে সন্তান-সন্ততিদের জীবনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, নিজেদেরও সফলতা ও আর্থিক স্বচ্ছলতার শিখরে নিয়ে গেছেন। তবে কেউ কেউ আবার সন্তান-সন্ততিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করাতেও ব্যর্থ হন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিচালিত এক গবেষণাকর্মে এমন ১৩০ জন শহীদ জায়ার (শহীদের স্ত্রী) জীবনসংগ্রামের চিত্র উঠে এসেছে। শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেমিনার হলে ‘মুক্তিযুদ্ধে পরিবার-প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম’ শীর্ষক এই গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে গবেষণাপত্রটির প্রাথমিক পর্যায় উপস্থাপন করেন এই উদ্যোগের মুখ্য গবেষক এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গবেষণা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপক ড. রেজিনা বেগম। সূচনা বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারা যাকের। প্যানেল আলোচক ছিলেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা এবং অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. বায়েজিদ খুরশিদ রিয়াজ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক আসিফ মুনীর তন্ময় প্রমুখ। সমাপনী বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী। সঞ্চালনা করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম।
গবেষণাপত্র তুলে ধরে ড. রেজিনা বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে স্বামীর মৃত্যুর সময় এসব শহীদ জায়ার কেউ একক, কেউ যৌথ পরিবারে বসবাস করতেন। তাদের স্বামীরা, যারা শহীদ হয়েছেন— তাদের কেউ কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, মেকানিক ও রিকশাচালকসহ নানা পেশায় ছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তারা। কিন্তু উপার্জনক্ষম পরিবারপ্রধানকে হারিয়ে তাদের স্ত্রীরাই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। কেউ শরণার্থী ক্যাম্পে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। কোনো কোনো নারী ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। যুদ্ধের পর শুরু হয় তাদের আরেক লড়াই।
গবেষণাপত্রে নেত্রকোনার সাজেদার জীবনসংগ্রাম তুলে ধরে বলা হয়, এই সাজেদা স্বামীকে নিয়ে কৃষিজীবী পরিবারে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বামী মারা যাওয়ার পর তার ভাসুর বাড়িঘর ও জমি দখল করে নেন। স্বাধীন দেশে ১৫ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় স্বামীর ভিটায় একটু জায়গা মেলে। গবেষণাকালে শহীদ জায়া সাজেদা জানিয়েছেন, ‘দেশের যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, আমার যুদ্ধ চলতেই থাকল। আমি কোথাও গিয়ে আশ্রয় পাইনি। নিজেকে খেয়ে পরে বাঁচতে হলে লোকের ঘরে কাজ করে খাওয়া ছাড়া কোনো পথ আমার ছিল না। দিনে কাজ করেছি, রাতে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি।’
মুখ্য গবেষক রেজিনা বেগম আরও জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক শহীদজায়া তাদের স্বামীর বাড়িতে জায়গা পাননি। তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারেননি। বিপুল সংখ্যক নারী পরিবারের প্রধান বা উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হন। এই শহীদজায়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থ উপার্জনে সম্পৃক্ত ছিলেন না। পাশাপাশি তাদের বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনায়ও তারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিলেন।
শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, একাত্তরের ২৫ মার্চ দেশে গণহত্যা শুরু হয়। আর সেদিন থেকেই মূলত এসব শহীদ জায়ার জীবনসংগ্রাম শুরু হয়। সেইসব লড়াকু নারীদের কথা আসলে আমরা মনেও রাখিনি। তবে এই গবেষণাপত্রে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা অজানা নারীদের সেই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে। এ ধরনের গবেষণা আরও বড় পরিসরে হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের শতভাগ সুবিধা পাচ্ছি। কিন্তু এর উৎস বা প্রত্যক্ষ শক্তি কারা, সেটা আমরা জানতে চাই না। মুক্তিযুদ্ধকে যারা ভুলে যেতে চায়, তাদের বুঝতে হবে মুক্তিযুদ্ধ এই দেশের অস্তিত্ব।
এই গবেষণা থেকে আরও অনেক গবেষণার দ্বার খুলে যাবে বলে মন্তব্য করে অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, আবেগবিবর্জিত কোনো গবেষণা হয় না। আবেগকে নিয়েই গবেষণা করতে হয়। এই গবেষণাপত্রে সেই আবেগকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গবেষণাপত্রটিকে সমৃদ্ধ করতে নানা রকম পরামর্শ দেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এই গবেষণাটি একটি প্রাথমিক ভিত্তি হতে পারে। এটি এখনো বই আকারে প্রকাশ যেহেতু হয়নি, তাই বলা যায় এটি প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এই কাজটি একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। এটি আরও বড় পরিসরে করা উচিত।
ডা. সারওয়ার আলী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এটি প্রাথমিক গবেষণাপত্র। এটিকে সমৃদ্ধ করা গেলে মুক্তিযুদ্ধের একটি অনালোচিত অধ্যায় নতুন চিন্তার খোরাক যোগাবে। মুক্তিযুদ্ধ যে ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়নি, বরং যুদ্ধে স্বামীহারা কিংবা পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটিকে হারিয়ে যে অথৈ লড়াই করেছেন আমাদের মায়েরা, তা উঠে আসবে।
সারা যাকের বলেন, আমাদের জীবনে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ প্রভাবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম প্রধান ব্যক্তিটিই মারা গেছেন। সেই পরিবারের যে জীবনসংগ্রাম, তা উঠে আসছে এই গবেষণাপত্রে।
- বিষয় :
- মুক্তিযুদ্ধ
- শহীদ
- নারী
