সরকারি ইউনানী-আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ
২২ মাস বেতনহীন চিকিৎসক-শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে স্থবির সেবা
চিকিৎসক-শিক্ষকদের কর্মবিরতি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ১৬:৪৩
২২ মাস ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় কর্মবিরতিতে গেছেন দেশের একমাত্র সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষক এবং চিকিৎসকরা। এতে রাজধানীর সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষা কার্যক্রম, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সংকটে পড়েছেন প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে আসা শত শত রোগী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত সোমবার থেকে শিক্ষক ও চিকিৎসক মিলিয়ে ৪২ জন কর্মবিরতি পালন করছেন। এর ফলে ক্লাস, পরীক্ষা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসাসেবা বন্ধ রয়েছে। আগে যেখানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিতেন, বর্তমানে সেখানে মাত্র ২০ জনের মতো রোগী সীমিত সেবা পাচ্ছেন। অনেক রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অল্টারনেটিভ কেয়ারের সভাপতি ডা. মো. মোকছেদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বেতন বন্ধ থাকলেও শিক্ষক ও চিকিৎসকরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কর্মবিরতির পথে গেছেন। তিনি বলেন, অবিলম্বে বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পভুক্ত পদগুলো রাজস্ব খাতে স্থানান্তর না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
১৯৮৩ সালে ‘বাংলাদেশ দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে এখানে বিইউএমএস ও বিএএমএস কোর্স পরিচালিত হয়। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। পাঁচ বছরের একাডেমিক শিক্ষা ও এক বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ শেষে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ অর্জন করেন।
প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও জনবল সংকটে চলছে প্রতিষ্ঠানটিতে। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নতুন কোনো পদ সৃষ্টি বা পদোন্নতি হয়নি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েশনের শর্ত পূরণে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ধাপে ধাপে ৪২ জন শিক্ষক ও চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক কাজ, পরীক্ষা ও হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসাসেবা তাদের ওপরই নির্ভরশীল।
শিক্ষক-চিকিৎসকদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের পদ বহাল রাখার প্রস্তাব দিলেও অর্থ মন্ত্রণালয় অধিকাংশ পদ বাদ দিয়ে আউটসোর্সিংয়ের সুপারিশ করেছে। ফলে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অন্যদিকে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শাখায় ৩৬টি রাজস্বখাতভুক্ত পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।
তাদের দাবি, বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক ও চিকিৎসকদের এসব শূন্য রাজস্বখাতে স্থানান্তর করা হলে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে।
শিক্ষক ও চিকিৎসকদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ৪২ জন শিক্ষক ও মেডিকেল অফিসারের বকেয়া বেতন অবিলম্বে পরিশোধ, উন্নয়ন প্রকল্পভুক্ত পদগুলো রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন।
তারা সতর্ক করে বলেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে দেশের ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
- বিষয় :
- বেতন বন্ধ
- কর্মবিরতি
- চিকিৎসাসেবা
