পশুর নামকরণে মনোযোগের অর্থনীতি ও রাজনীতি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৯:১৭ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ০৯:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কেবল নামের কারণে বিশ্বজুড়ে মানুষের নজর কেড়েছে বাংলাদেশের কয়েকটি মহিষ। আসছে ঈদুল আজহায় কোরবানি হতে যাওয়া মহিষগুলোর নাম এতদিনে অনেকেরই জানা হয়ে গেছে– ডোনাল্ড ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, মোদি। রাষ্ট্রীয় নেতাদের পাশাপাশি এমন তালিকায় ফুটবল তারকা ‘নেইমার’ নামটিও আছে।
কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশুর হাট কিংবা খামারে সমসাময়িক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গরু-মহিষের নামকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো– এই নামকরণের পেছনে ঠিক কী ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করে, কেন সাধারণ মানুষ একজন ক্ষমতাধর নেতার নাম কোরবানির পশুর সঙ্গে যুক্ত করছে এবং ডিজিটাল যুগের অ্যাটেনশন ইকোনমি বা মনোযোগের অর্থনীতি কীভাবে এই ঝোঁককে উস্কে দিচ্ছে?
গত ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের অ্যালবিনো জাতের একটি মহিষের ছবি ছাপা হয় সমকালের শেষ পাতায়। সর্বশেষ বার্তা সংস্থা এএফপি মহিষটিকে নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন করে। এরপর মহিষগুলোর কথা ছড়িয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকাতে। প্রতিবেদন প্রকাশ করছে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গণমাধ্যম।
টেলিগ্রাফ তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশে কোরবানি হতে যাচ্ছে অ্যালবিনো মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্প’। এতে বলা হয়েছে, সোনালি রঙের বাহারি চুলের কারণে মহিষটির নাম রাখা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম অনুসারে। প্রায় দেড় হাজার পাউন্ড ওজনের এই মহিষটি ইতোমধ্যে তারকা বনে গেছে।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, চলতি মাসের শুরু থেকে ঢাকার নারায়ণগঞ্জে জিয়া উদ্দিন মৃধার খামারে মহিষটি দেখতে উৎসুক জনতা ভিড় করছে। জিয়ার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, চার বছর বয়সী এই মহিষকে তিনি এক বছর ধরে লালন-পালন করেছেন। কোরবানির পর তিনি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুব মিস করবেন’।
ফ্রান্সের জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল টিএফওয়ান তাদের ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমের পেজে মহিষটিকে নিয়ে একটি শর্ট ভিডিও প্রকাশ করেছে। বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, ‘মহিষটির চুলের বাহার নিখুঁত রাখতে মালিকরা প্রতিদিন সেটি ব্রাশ করেন।’ গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ফরাসি ভাষার এই গণমাধ্যমটির শর্ট ভিডিও ইউটিউবে প্রায় চার লাখ বার দেখা হয়েছে। ফেসবুক পেজে দেখা হয়েছে ৬২ লাখের বেশি।
মহিষটি নিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের দৈনিক ডন। তারা শিরোনাম করেছে, ‘কমান্ডার-ইন-বিফ: বাংলাদেশিজ ডোনাল্ড ট্রাম্প বাফেলো উইনস ফ্যানস’। একই শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইসরায়েলের গণমাধ্যম ওয়াইনেট। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নামে নারায়ণগঞ্জে আরেকটি মহিষের নাম রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটি শান্ত স্বভাবের হলেও ‘নেতানিয়াহু’ ক্ষ্যাপাটে ও বদমেজাজী। বাংলাদেশি ইংরেজি ভাষার গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট আরও লিখেছে, এই মহিষটির গায়ের পশম ও চোখের চাহনির সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এক ধরনের সাদৃশ্য আছে।
নারায়ণগঞ্জের একটি খামারের মালিক জিয়া উদ্দিনের উদ্ধৃতিতে ব্যাংকক পোস্ট লিখেছে, প্রায় ১০ মাস আগে রাজশাহীর হাট থেকে একটি মহিষ কেনা হয়েছিল। এরপর জিয়ার ভাই সেটির নাম রাখেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএ টুডে লিখেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে নাম রাখা একটি মহিষ দেখতে বাংলাদেশে খামারে ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। একই বর্ণনা দিয়েছে ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নামে নারায়ণগঞ্জে একটি লম্বা দাড়ির মহিষের নামকরণ হয়েছে। আর কে এগ্রো ফার্ম লিমিটেডের আরেকটি মহিষকে অনেকে ‘নেতানিয়াহু’ নামে ডাকছেন। এই নাম নিয়েও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
যদিও আর কে এগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজির হোসেনের ভাষ্য, তারা কোনো মহিষের নাম মোদি বা নেতানিয়াহু রাখেননি। তিনি বলেন, মহিষটি আমাদের খামারের হলেও এই নাম আমরা দিইনি। ফেসবুকে কেউ এমন নাম দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের ফেসবুক পেজে বিষয়টি উল্লেখ করে পোস্টও দিয়েছি।
মনোযোগের অর্থনীতি
মনোযোগের অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো আধুনিক বিশ্বে তথ্যের কোনো অভাব নেই, বরং অভাব আছে মানুষের মনোযোগের। তাই যেখানে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়, অর্থের প্রবাহ সেদিকেই যায়। সমকালের ১৩ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের মহিষটি লাইভ ওয়েট হিসেবে প্রতি কেজি ৫৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সে হিসাবে মোট দাম পড়েছে তিন লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ঈদুল আজহায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়। এমন পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, দেশে ঈদ ঘিরে গবাদি পশু লালন-পালন ও বিক্রি একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক কাজ। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের খামারের পশুকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করাটাও কৌশলে পরিণত হয়েছে।
যেমন– ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষটি সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের যে বিপুল মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তা সাধারণ বিপণন কৌশলের মাধ্যমে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। গত কয়েক বছরের প্রবণতা দেখাচ্ছে, ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সাররা মূলত পশুর হাটে ‘ভাইরাল মার্কেটিং’-এর প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেন। এটি এমন এক বিপণন কৌশল, যা মানুষের আবেগ, কৌতূহল ও বিনোদনের অনুভূতি কাজে লাগিয়ে কোনো কনটেন্টকে দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও অস্বাভাবিক বা কৌতূহলোদ্দীপক কনটেন্ট খুব দ্রুত মানুষের ফিডে ছড়িয়ে দেয়। যেমন– নারায়ণগঞ্জের খামারটিতে যাওয়া দর্শনার্থীরাই বলছেন, তারা সামাজিক মাধ্যমে তথ্য পেয়ে মহিষটি দেখতে গেছেন।
রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব
নারায়ণগঞ্জের মহিষটি নিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেটির মন্তব্যের ঘরে একজন লিখেছেন, ‘মেক ক্যাটল গ্রেট অ্যাগেইন’। এই মন্তব্যটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রচার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-এর অনুকরণে করা হয়েছে।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে মন্তব্যের ঘরে আরেক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে পার্থক্য হলো, মহিষটির নাম এপস্টেইন ফাইলে নেই’। কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের অপরাধের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত নথি এপস্টেইন ফাইল নামে পরিচিত। যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের নাম আছে।
এই দুটি মন্তব্য দেখাচ্ছে, কোরবানির পশুর নাম দেখেই পাঠকের রাজনৈতিক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে। অর্থাৎ তারা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে পরোক্ষভাবে ব্যঙ্গ করার সুযোগ পেয়েছেন। বিষয়টির আরও ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় রাশিয়ান দার্শনিক মিখাইল বাখতিনের ‘কার্নিভালেস্ক’ তত্ত্বে।
বাখতিনের মতে, কার্নিভাল বা মেলা হলো এমন একটি স্থান, যেখানে সমাজের প্রতিষ্ঠিত সব নিয়মকানুন, আনুষ্ঠানিকতা, শ্রেণিবিন্যাস এবং ক্ষমতার দম্ভ সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। কার্নিভালের সময় সমাজে একটি বিপরীত পৃথিবী তৈরি হয়। নামকরণের ঝোঁক বিবেচনায় ধরলে বাংলাদেশের কোরবানির পশুর হাটগুলো সেই কার্নিভালেস্ক তত্ত্বের একটি নিখুঁত উদাহরণ। একজন সাধারণ কৃষক ও গরুর ব্যাপারী যখন তাঁর গবাদি পশুর নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বা ‘নেতানিয়াহু’ রাখেন, তখন তিনি মূলত বাখতিনের সেই ‘বিপরীত পৃথিবীর’ জন্ম দেন। যেখানে বিশ্ব রাজনীতির পরাক্রমশালী ব্যক্তিরা নগণ্য ও ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রে পরিণত হন।
বিষয়টিকে আরেকভাবেও দেখা যায়। তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের পক্ষে ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহুর মতো ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ সমালোচনা কিংবা তাদের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা অসম্ভব। কিন্তু কার্নিভালের পরিবেশে (কোরবানির পশুর হাট) ক্ষমতাধর ব্যক্তির নাম এমন এক প্রাণীর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেটিকে দড়ি দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। যে দৃশ্য দেখাটাও একজন সাধারণ দর্শকের কাছে প্রতীকী বিজয়। সামাজিক মাধ্যমে টেলিগ্রাফ ও ডনের পোস্ট করা প্রতিবেদনের মন্তব্যেও পাঠকরা এমন কথা লিখেছেন।
বাখতিনের তত্ত্ব অনুসারে, এটি এক ধরনের লুক্কায়িত প্রতিরোধ, যা সরাসরি রাজনৈতিক বিক্ষোভের পরিবর্তে ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মোড়কে প্রকাশ পায়। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অজ্ঞতাকে ব্যঙ্গ করতে পরিবেশবাদীরাও একটি উভচর প্রাণীর নাম রেখেছেন ‘ডেরমোফিস ডোনাল্ড ট্রাম্পি’।
