দনিয়ার ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ
‘অপমানে’ ছাত্রীর আত্মহত্যা, প্রতিষ্ঠাতা মবের শিকার
সকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৯:২৭ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১১:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর দনিয়া এলাকায় ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুন নাহারের আত্মহত্যার ঘটনায় মব সহিংসতার শিকার হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মাসুদ হাসান লিটন। তাঁর দুর্ব্যবহারের শিকার হয়ে সাবিকুন নাহার আত্মহত্যা করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর জেরে চেয়ারম্যানকে বেধড়ক মারধর করা হয়। তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সাবিকুনের সহপাঠীদের সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার তাদের বাংলা ও অর্থনীতি বিষয়ের মডেল টেস্ট ছিল। সাবিকুন অর্থনীতি পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়তো ভালো ছিল না। পরীক্ষা চলাকালে সে চুপচাপ বসেছিল। এরপর খাতায় কিছু একটা আঁকা শুরু করে। সেটা দেখতে পেয়ে এক শিক্ষিকা তার খাতাটা নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ হাসান লিটনের কাছে পাঠান। অনেকটা সময় ধরে সাবিকুনকে বকাঝকা ও তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন মাসুদ হাসান। এ ছাড়া সাবিকুনের মাকেও ডেকে পাঠানো হয়।
সহপাঠীদের অভিযোগ, পরে বিষয়টি নিয়ে বাসায়ও সাবিকুনকে বকাঝকা করা হয়। এতে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এতে ওই দিন বিকেলে দনিয়ার বাসায় আত্মহত্যা করে সাবিকুন।
পরদিন বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভে নামে। তারা মাসুদ হাসানের বিচার দাবিতে স্লোগান দেয়। এক পর্যায়ে তা মব সহিংসতায় রূপ নেয়। মাসুদকে রাস্তায় ফেলে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়।
শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকাবাসী ও পাশের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলার কারণে ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সুনাম রয়েছে। তবে সেখানে অতিরিক্ত কড়াকড়ি ও শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ পুরোনো। সাবিকুনের মৃত্যু ঘিরে পরদিন বৃহস্পতিবার মব সহিংসতার পেছনে এলাকার একটি অংশের উস্কানিও ছিল।
‘ডিসিপ্লিনের নামে নির্যাতন’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী জানায়, ‘একদিন পড়া না পারায় লিটন স্যার আমাকে এমনভাবে হাতে মেরেছিলেন যে চামড়া ফেটে রক্ত বের হয়েছিল। মা স্কুলে অভিযোগ করতে গেলে তাঁকেও অপমান করা হয়।’
একজন অভিভাবক বলেন, ‘৫০ নম্বরের পরীক্ষায় ২ নম্বর কম পেলেও দুইটা বেতের বাড়ি, চার নম্বর কম পেলে চারটা বাড়ি, এটা যেন নিয়ম ছিল। ছাত্রীদের গালাগাল করা হতো, ছেলেদেরও অপমানজনক কথা বলা হতো। বাইরে থেকে এটাকে ডিসিপ্লিন বলা হলেও ভেতরে ছিল ভয় ও মানসিক চাপের পরিবেশ।’
কোচিং থেকে ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ
স্থানীয়রা জানান, মাসুদ হাসান এক সময় দনিয়া এলাকায় বাসায় বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়াতেন। পরে পাঠশালা গলিতে একটি কোচিং সেন্টার চালু করেন। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর স্ত্রী ও শ্যালক পরিচালক হিসেবে আছেন। শ্যালক রানার বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ আছে। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য নানাভাবে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।
অধ্যক্ষের বক্তব্য, ফোন ধরেননি চেয়ারম্যান
ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মঈদুর রহমান বলেন, ‘সহপাঠীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ ছিল। আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তারা শোনেনি।’
তবে সাবিকুনকে গালাগাল ও তার মাকে ডেকে পাঠানোর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।
চেয়ারম্যান মাসুদ হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে মেসেজ পাঠানো হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনিও রিসিভ করেননি।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা
কদমতলী থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা জেনেছি, মায়ের ওপর অভিমান করে সে (সাবিকুন) আত্মহত্যা করেছে। পরিবারের অনুরোধে ময়নাতদন্ত করা হয়নি, শুধু সুরতহাল করা হয়েছে। এ ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে।’
তবে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর বড় একটি অংশ বলছে, ঘটনার পেছনে কী ঘটেছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা জরুরি। একই সঙ্গে তারা মব সহিংসতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নরসিংদী ও শিবপুর প্রতিনিধি জানান, সাবিকুন নাহারের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার আয়ুবপুর ইউনিয়নের ঘাসিরদিয়া পূর্বপাড়ায়। দনিয়ার নাসির উদ্দীন সড়কের একটি ভাড়া বাসায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত সে। গত বৃহস্পতিবার সকালে গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হয়।
সাবিকুনের চাচা ইঞ্জিনিয়ার রাশিদুল কবির ভুইয়া স্বপন বলেন,‘আমরা জানতে পেরেছি, বিদ্যালয়ের পরীক্ষার খাতায় কম নম্বর পাওয়ায় তাকে (সাবিকুন) ক্লাস রুমে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এতে সে অপমান বোধ করায় আত্মহত্যা করে। তবে এ ব্যাপারে কারও বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ নেই।’
- বিষয় :
- আত্মহত্যা
- মব
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
