জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে চাপে মানুষ
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল গত এপ্রিলে। সেই ধাক্কায় বেড়েছে গাড়ি ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন খরচ। এর মধ্যেই জুনে আবার বাড়ল অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম। আজ বুধবার বিদ্যুতের নতুন দরের ঘোষণা আসছে, যা চলতি জুন থেকেই কার্যকর হতে পারে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের বাস্তবতা দেখিয়ে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামাল দিতে বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুতের দর বাড়ার পেছনে রয়েছে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক চাপ।
তবে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারের ভর্তুকির বোঝা কিছুটা কমলেও এর প্রধান ভার বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা জনগণের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও অনিয়মের কারণে সৃষ্ট ঘাটতির বোঝা জনগণের ওপর চাপানো উচিত নয়। ঘাটতির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে অপচয় ও অদক্ষতা দূর করার পরই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত সোমবার বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে দাম কমলে সেই সুবিধাও দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
গত এপ্রিলে দুই দফায় ৫৯৯ টাকা বাড়ে এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম। মে মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকে। তবে জুনের জন্য ১২ কেজিতে ৫৫ টাকা কমিয়ে দাম এক হাজার ৮৮৫ টাকা করা হয়েছে।
এপ্রিলে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। তখন অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা, ডিজেলে ১৫ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা বাড়ানো হয়। মে মাসে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম লিটারে পাঁচ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি হয়েছে। আজ নতুন দর ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। কত শতাংশ বাড়বে– সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। তবে সূত্র জানিয়েছে, পাইকারি পর্যায়ে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ দাম বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) করার আবেদন করে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডেসকো ৯.৬৭ শতাংশ, ডিপিডিসি ৬.৯৬ শতাংশ, ওজোপাডিকো ১০ শতাংশ, আরইবি ৫.৯৩ শতাংশ, নেসকো ইউনিটপ্রতি ৩ পয়সা এবং পিডিবি ২৯ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করে। পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ) প্রতি ইউনিটে সঞ্চালন চার্জ যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ পয়সা বাড়ানোর দাবি জানায়।
রাজধানীর মালিবাগের বাসিন্দা কবীর হোসেন বলেন, সব কিছুর দাম বাড়ছে, তবে সেভাবে আয় বাড়ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়াতেই হয়, তাহলে যাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে খরচ বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়? সব দায় কি সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে?
পুরানা পল্টনের হকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এলপিজির দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে মাস চলতে হিমশিম খেতে হয়। এখন আবার বিদ্যুতের দাম বাড়বে। এভাবে কী জীবন চলে?
ঢাকার গোপীবাগের বাসিন্দা গৃহিণী নাজমা বেগম বলেন, জ্বালানি তেল আর গ্যাসের দাম বাড়ার পর সংসারের খরচও বেড়ে গেছে। বাজারে গেলে এখন আর আগের মতো তালিকা ধরে কেনাকাটা করা যায় না। এক কেজি চাল, তেল, সবজিতেই হিসাব করতে হয়।
রাইড শেয়ারিং চালক সুমন মিয়া বলেন, অকটেনের দাম বেড়েই চলছে। যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে চান না। যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। আগে দিনে কিছুটা সঞ্চয় থাকত, এখন সেটা আর হয় না।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ঈদের আগে সমকালকে বলেছিলেন, রপ্তানি খাত এরই মধ্যে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও ব্যয় চাপের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ালে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তিনি বলেন, শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্যাবের সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের আগে এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করে। কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও সেবা– সব খাতে ব্যয় বাড়ে, যার ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি, দাম নয়। উৎপাদন খরচ বাড়লে রপ্তানি খাতও চাপে পড়বে।
- বিষয় :
- ব্যয় পরিশোধ
- জীবন
