ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

বিদ্যুৎ খাতে অলস সক্ষমতার বিপুল ভার মানুষের ওপর

বিদ্যুৎ খাতে অলস সক্ষমতার বিপুল ভার মানুষের ওপর
×

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে সবচেয়ে সমালোচিত বিষয় ছিল বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ। উৎপাদনে না থাকলেও কেন্দ্র মালিককে এ অর্থ দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ জ্বালানি তথা সামগ্রিক অর্থনীতির সর্বনাশা বীজ লুকিয়ে আছে বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক ক্যাপাসিটি পেমেন্টে। এই চার্জ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। 

২০১১-১২ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। মাত্র এক বছরে বেড়েছে ২৪ শতাংশ। এই ১৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জে রাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। 

চলতি অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দাঁড়াবে ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।

গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়মুক্তির আইনে করা সব অসম বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি করা হয়। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের কমিটি এই চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ক্যাপাসিটি চার্জকে চিহ্নিত করা হয়। 
তারা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিকে পরিশোধ করা বিলের সবচেয়ে প্রধান অংশ এখন ক্যাপাসিটি চার্জ। সাধারণত ১২ বছরের মধ্যে প্রকল্পের ঋণের টাকা শোধ হয়ে যায়, কিন্তু চুক্তির কারণে ১৩ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত উচ্চ হারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

বাড়তি চাহিদা
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে চাহিদার চেয়ে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫৪ শতাংশ বেশি। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। যদিও এটি মাত্র এক দিনের উৎপাদন। গড় উৎপাদন ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট। তার পরও ১৭ হাজার মেগাওয়াটকে হিসাবে ধরলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। আর গড় উৎপাদন ধরলে বলা যায় অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্রই বসে থাকে। যদিও রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের বিবেচনায় চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা কিছুটা বেশি থাকতে হয়। একে রিজার্ভ মার্জিন বলে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে রিজার্ভ মার্জিন হিসেবে চাহিদার ২০ শতাংশ বেশি থাকা উচিত। সে অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা ১৯-২০ হাজার মেগাওয়াট হলেই যথেষ্ট। পিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, রিজার্ভ মার্জিন ২০ শতাংশের আশপাশে থাকা ভালো। এর বেশি হলে ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি দিতে হবে। আর কম হলে লোডশেডিং হবে।

ক্যাপাসিটি চার্জ
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল পাঁচ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ছয় হাজার ২৭ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছয় হাজার ৪৬১ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাত হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় দাঁড়ায় ৯ হাজার ২৪০ কোটি টাকা, পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ১২ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৫ হাজার ১১৪ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৭ হাজার ২৩৮ কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়।

তবে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে আবার বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই বছরে ব্যয় দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, যা পরের অর্থবছরে বেড়ে হয় ৩৬ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি পৌঁছায় ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায়। এই ১৪ অর্থবছরে এ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে হতে পারে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। ক্রমবর্ধমান এই ব্যয়ের কারণে সরকার এরই মধ্যে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করেছে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভোক্তারা এখন মূলত ব্যবহৃত বিদ্যুতের বদলে অলস বা অচল সক্ষমতার খরচ বহন করছেন। খাতসংশ্লিষ্টদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি ও ক্রয় খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ আগামী বছরগুলোতেও উচ্চ পর্যায়ে থাকবে।

মুনাফা লুটেছেন ব্যবসায়ীরা
আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে ডজনখানেক কোম্পানি ফুলেফেঁপে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। অভিযোগ আছে, তাঁর অফিস থেকেই তাঁর নির্দেশনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দেওয়া হতো পছন্দের কোম্পানিকে। বিশেষ আইনের সুযোগ নিয়ে দরপত্র ছাড়াই সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তি সই হতো, প্রয়োজন না থাকলেও বাড়ানো হতো মেয়াদ।

এমন সুবিধা পাওয়া কেন্দ্রগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্রের এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল। তাদের ঘোড়াশাল ১৪৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি ২০১০ অর্থবছরের আগস্টে উৎপাদনে আসে। কেন্দ্রটির জন্য এগ্রিকোর বিনিয়োগ ছিল ৫৬০ কোটি টাকা। তিন বছর মেয়াদি কেন্দ্রটির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চালানো হয়। এই আট বছরে কেন্দ্রটি শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা, যা বিনিয়োগের প্রায় সাড়ে চার গুণ। এভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা শত শত কোটি টাকা নিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনেও এমন চিত্র উঠে এসেছে।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দিয়ে কমিশন বাণিজ্য হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩০০ কোটি ডলার নয়ছয় হয়েছে। বিনা দরপত্রে চুক্তি করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কয়েকবার চুক্তি নবায়নের সময়ও তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমলা, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠতা ব্যবসায়ীদের সুবিধাজনক (বাড়তি) দর, শর্ত ইত্যাদি আদায়ের সুযোগ করে দিত। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এ ধরনের চুক্তি সম্ভব নয়।

সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার হয়নি
পিডিবির তথ্যমতে, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ১৫ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে। যদিও এ সময় বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার হয়নি। কিছু কিছু কেন্দ্র বছরে সক্ষমতার ২-৩ শতাংশ উৎপাদন করেছে। তবে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হবে, এমন শর্তেই চুক্তির সময় ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

 

আরও পড়ুন

×