ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

প্রকৃতি

পুষ্পরাজ্যের মোহনীয় রাজকন্যা নন্দিনী

পুষ্পরাজ্যের মোহনীয় রাজকন্যা নন্দিনী
×

ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের একটি নার্সারিতে সাদা নন্দিনী ফুল। ছবি: লেখক

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:৫২

প্রকৃতির অবারিত দান পুষ্পরাজি। আর এই পুষ্পরাজ্যের এক মোহনীয় রাজকন্যার নাম নন্দিনী, যা বিশ্বজুড়ে ইউস্টোমা বা লিসিয়েন্থাস নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Russelianum grandiflorum, এটি Gentianaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এর নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক স্নিগ্ধ আভিজাত্য। গোলাপের মতো গঠন আর রেশমের মতো কোমল পাপড়ির কারণে এটি ফুলপ্রেমীদের কাছে অনন্য আকর্ষণের নাম। 

লিসিয়েন্থাস নামটা এসছে দুটো গ্রিক শব্দ lissos ও Anthos থেকে। লিসোস মানে মসৃণ আর অ্যান্থোস মানে ফুল। পাপড়িগুলো এতটাই মসৃণ যে হাত দিলে মনে হয় কোনো দামি রেশমি কাপড়ের স্পর্শ। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র তীরের বাংলাদেশ নার্সারি থেকে বেগুনি নন্দিনীর ছবিটি গত ৩ মে এবং সাদা নন্দিনীর ছবিটি ১২ মে তোলা।

নন্দিনী মূলত উত্তর আমেরিকা, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের বন্য ফুল। তবে এই ফুলের বর্তমান যে নয়নাভিরাম রূপ আমরা দেখি, তার কৃতিত্ব জাপানি বিজ্ঞানীদের। একসময় উত্তর আমেরিকার রকি পর্বতমালা এলাকায় ফুলটি বুনো অবস্থাতেই ফুটত। গ্রীষ্মে বরফ গলার পর ফুল বেরিয়ে আসত। পরে জাপানিরা ফুলটি তাদের দেশে এনে গবেষণার ভেতর দিয়ে সেখানকার আবহাওয়ার উপযোগী করে তোলেন। 

১৯৯৭ সাল থেকে জাপানি এই দলের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আ ফ ম জামাল উদ্দিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের চরিত্র নন্দিনীর নামানুসারে তিনি এই ফুলের নাম নন্দিনী রাখেন। প্রায় দুই দশক ধরে বিদেশি এই ফুল নিয়ে কাজ করছেন তিনি। জাপান থেকে তিনি এর বীজ ও মাটি নিয়ে এসেছিলেন। সেই মাটিতে ২০০৭ সালে প্রথম ফুটেছিল ফুলটি। জাপানে এখন এটি গোলাপ ও টিউলিপের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

নন্দিনী ফুল দেখতে গোলাপের মতো, কিন্তু এর কোনো কাঁটা নেই। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা– সব ঋতুতে ফোটে খরা আর বর্ষাসহিষ্ণু এই ফুল। খাড়া পাতাসহ এই ফুল অনেকটা টিউলিপ ফুলের মতো। নন্দিনী ফুল সাধারণত একক বা থোকায় থোকায় ফোটে। ছয়টি পাপড়ি ঘিরে রেখেছে একটি স্ত্রীকেশর ও পাঁচটি পুংকেশরকে। ফুলের পাতার সম্মুখ প্রান্ত কিছুটা তীক্ষ্ণ।

বর্ণবৈচিত্র্যের দিক থেকে নন্দিনী অতুলনীয়। এটি সাদা, গোলাপি, বেগুনি, নীল ও ল্যাভেন্ডার রঙের হতে পারে। আবার কিছু ফুলের পাপড়ির প্রান্তে থাকে ভিন্ন রঙের বর্ডার, যাকে ‘বাই-কালার’ লিসিয়েন্থাস বলা হয়। এর হালকা সুবাস মনে প্রশান্তি এনে দেয়। সাধারণত বীজ থেকে এই গাছ তৈরি করা হয়, তবে টিস্যু কালচারের মাধ্যমেও এর চারা উৎপাদন সম্ভব।

নন্দিনী শুধু বাগান সাজাতেই নয়, বাণিজ্যিক ফুল হিসেবেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর বিশেষ গুণ হলো এটি কাটার পর অনেক দিন সতেজ থাকে। একগুচ্ছ নন্দিনী ফুলদানিতে রাখলে অনায়াসে ১০ থেকে ১৫ দিন তা তাজা থাকে, যা খুব কম ফুলের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এ কারণে বিয়ে, জন্মদিন বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে তোড়া তৈরিতে নন্দিনীর চাহিদা আকাশচুম্বী।

পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে লিসিয়েন্থাস বা নন্দিনীকে কৃতজ্ঞতা, প্রশংসা এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্ধনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কাউকে সম্মান জানাতে বা কারও প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে একগুচ্ছ নন্দিনী উপহার দেওয়া একটি চমৎকার রীতি।

নাগরিক জীবনে একচিলতে প্রশান্তি এনে দিতে পারে একগুচ্ছ নন্দিনী। এর ডাগর চোখ মেলে তাকিয়ে থাকা পাপড়িগুলো যেন জীবনের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। আপনি যদি আপনার বাগান বা ঘরের কোণকে আভিজাত্যে ভরিয়ে তুলতে চান, তবে নন্দিনী হতে পারে আপনার প্রথম পছন্দ। প্রকৃতির এই অসাধারণ সৃষ্টিকে ভালোবাসুন এবং আপনার চারপাশকে করে তুলুন আরও বর্ণিল।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

আরও পড়ুন

×