পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণকে শিল্পভাষায় ধারণ
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের আলোকি প্রাঙ্গণে শালা নেবারহুড স্পেসে চলছে দলীয় প্রিন্টমেকিং প্রদর্শনী ‘অ্যা টার্নিং মোমেন্ট’। গতকাল রোববার তোলা। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১২:৫৬
দেয়ালজুড়ে সাজানো সাদাকালো ছবি। কোথাও মানুষের মুখাবয়ব, কোথাও পাখি, বৃক্ষ, প্রাণী কিংবা লোকজ জীবনের প্রতীকী উপস্থাপন। আলোর নরম আবহে দর্শকরা একেকটি শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজে নিচ্ছেন নিজস্ব পাঠ। শিল্পকর্মগুলোর ভেতরে যেন একই সঙ্গে ধরা পড়ছে স্মৃতি, ইতিহাস, পরিচয় ও পরিবর্তন।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের আলোকি প্রাঙ্গণে অবস্থিত শালা নেবারহুড স্পেসে প্রবেশ করলেই এমন এক শিল্প-অনুভূতির মুখোমুখি হচ্ছেন দর্শনার্থীরা। সেখানে চলছে দলীয় প্রিন্টমেকিং প্রদর্শনী ‘অ্যা টার্নিং মোমেন্ট’।
গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় উদ্বোধন হওয়া এই প্রদর্শনী শিল্পপ্রেমীদের কাছে হয়ে উঠেছে সমকালীন শিল্পভাবনার এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। প্রদর্শনী ঘুরে দেখা দর্শকদের কেউ শিল্পকর্মের সূক্ষ্ম রেখা ও বিন্যাসে খুঁজে পাচ্ছেন ব্যক্তিগত স্মৃতির প্রতিধ্বনি, কেউবা আবিষ্কার করছেন সমাজ, সংস্কৃতি ও সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতার নানা ইঙ্গিত।
‘অ্যা টার্নিং মোমেন্ট’, অর্থাৎ ‘বাঁকমুহূর্ত’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের এক গভীর দর্শন। জীবনের এমন এক সন্ধিক্ষণকে বোঝায় এই শব্দ, যখন একটি পথ অন্যদিকে মোড় নেয়, একটি অবস্থান থেকে শুরু হয় নতুন যাত্রা। সেই ভাবনা থেকেই নির্মিত হয়েছে প্রদর্শনীর সামগ্রিক ধারণা। এখানে পরিবর্তনকে কোনো আকস্মিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘ ও চলমান এক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে।
জীবনের পথচলায় এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা নিঃশব্দে বদলে দেয় মানুষের চিন্তা, সম্পর্ক, পরিচয় কিংবা বাস্তবতাকে। কখনও তা ব্যক্তিগত উপলব্ধির ভেতর জন্ম নেয়, কখনও সামাজিক বা রাজনৈতিক অভিঘাতে, আবার কখনও পরিবেশ ও সময়ের পরিবর্তনে। প্রদর্শনীর শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে সেই সব রূপান্তরময় মুহূর্তের অনুসন্ধান করেছেন।
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পকর্মগুলোতে কখনও দেখা যায় মানুষের অন্তর্জগতের গল্প, কখনও লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অনুষঙ্গ, আবার কখনও সমকালীন জীবনের অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের প্রতীকী উপস্থাপন। প্রিন্টমেকিংয়ের ভাষাকে ব্যবহার করে শিল্পীরা অনুসন্ধান করেছেন সীমারেখা অতিক্রমের অভিজ্ঞতা, পূর্বধারণার পুনর্বিবেচনা, নতুন উপলব্ধির জন্ম এবং অজানার মুখোমুখি হওয়ার সাহসকে। ফলে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে রূপান্তরের বহুমাত্রিক বয়ান।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী মনিরুল ইসলাম এবং সংস্কৃতিকর্মী লুভা নাহিদ চৌধুরী।
মোট ২০ শিল্পীর ৩৬টি শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো এ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন এ. আসান, আফসানা শারমিন ঝুম্পা, অমল আকাশ, অনুকূল চন্দ্র মজুমদার, আশাং মং, আজিজি ফাওমি খান, ফাইজা ফিরোজ রিমঝিম, জয়তু চাকমা, খন্দকার নাসির আহাম্মেদ, লিটন চন্দ্র সরকার, মুবতাসিম আলভী, মুস্তাফা জামান, নিয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, নাজমুল হোসেন নয়ন, রাকিব আনোয়ার, রাজিব দত্ত, সাজন রানা, সালাউদ্দিন, সুমনা আক্তার এবং শুভ ও সাহা। ভিন্ন ভিন্ন শিল্পভাষা, অভিজ্ঞতা ও নন্দনতাত্ত্বিক অবস্থান থেকে তারা প্রত্যেকে বাঁকমুহূর্তর ধারণাকে নিজস্ব ব্যাখ্যায় প্রকাশ করেছেন।
দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন খুঁজে পাচ্ছেন। কেউ দেখছেন পরিবর্তনশীল সমাজের প্রতিচ্ছবি, কেউবা মানবিক সম্পর্কের জটিলতা কিংবা স্মৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা গল্প। এই বহুমাত্রিক পাঠের সুযোগই প্রদর্শনীটিকে কেবল শিল্পকর্ম প্রদর্শনের আয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে এক চিন্তাশীল অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
আয়োজকদের মতে, ‘অ্যা টার্নিং মোমেন্ট’ মূলত এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সমকালীন বাস্তবতা নিয়ে শিল্পীদের নানা ভাবনা ও প্রতিক্রিয়া একত্র হয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের জটিলতা, সংকট, সম্ভাবনা এবং মানবিক অভিজ্ঞতার নানা স্তরকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে।
- বিষয় :
- শিল্পকর্ম
