জন্মজয়ন্তী
দুর্দিনে কবি নজরুলকে বড় প্রয়োজন
মফিদুল হক
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১২:২৭ | আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ | ১৪:২২
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের মার্চে বাঙালি পল্টনজীবনের সমাপ্তি টেনে একুশ বছরের কাজী নজরুল ইসলাম করাচির সেনানিবাস থেকে ফিরে এলেন কলকাতায়, তাঁর পেটিকায় তখন ছিল দুটি কেতাব, একটি ফার্সি, হাফেজের দিওয়ান ও অন্যটি বাংলা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি। এমন দুই অধ্যাত্মচেতনার গ্রন্থ যাঁর ভ্রমণসঙ্গী, তিনি আবার অন্তরে বিদেশি শাসনের জোয়ালমুক্ত হওয়ার ভাবনায় প্রবলভাবে আলোড়িত।
গভীরে তাকালে বোঝা যাবে, এই যুবকের মানসিকতার বিস্তার বিপুলা। দেশও তখন উত্তাল হিন্দু-মুসলমানের মিলিত মুক্তি-আন্দোলন অসহযোগ-খিলাফতের ডাকে, মোহনদাস গান্ধী ও আলী ভাইয়েরা যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নজরুল তাই ফিরলেন না চুরুলিয়ায়, কিংবা আসানসোলে, পল্টন-ফেরতা হিসেবে গ্রহণ করলেন না কোনো সরকারি চাকরি, যা ছিল প্রাপ্য, বরং বরণ করলেন সাহিত্যব্রতীর জীবন, একের পর এক চমক সৃষ্টি করে চললেন বাংলা সাহিত্যবৃত্তে, আর গাইতে শুরু করলেন গান। সেই সঙ্গে স্বভাবগত চেতনা নিয়ে বাংলার বিপ্লবসাধনা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্তি ঘটে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে। ১৯২১ সালের শেষাশেষি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে সাহিত্যের ললাটে তিনি রক্তরেখায় এঁকে দিলেন দীপ্ত জয়শ্রীর রাজটিকা। এরপর বের হলো তাঁর প্রথম কবিতার বই, ‘অগ্নিবীণা’ নামই বহন করে অভিনবত্ব, বীণার তারে ঝংকৃত যেন আগুন।
এরপর অসহযোগ-খেলাফত আন্দোলনে যখন ভাটার টান, গান্ধী-চিত্তরঞ্জন দাশসহ নেতারা কারাগারে, ‘বাংলার কথা’ পত্রিকার জন্য নজরুল লিখলেন গান, ‘কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট।’ নিজের লেখা গানে সুরারোপ করে নিজে গাইলেন সেই গান সভা সমিতিতে সমাবেশে। আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলেও দমে যাননি নজরুল, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত মুক্তিসাধনা ও জীবনধারার সবচেয়ে বলিষ্ঠ নিবিড় ও গভীরতম সাধনার রূপকার হয়ে উঠলেন তিনি, যেমন কবিতায় গানে সাহিত্যে, তেমনি জীবনকর্মে। ১৯২২ সালে তিনি প্রকাশ শুরু করলেন অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গির বাইরে গিয়ে নজরুলকে যথার্থভাবে বুঝে দিয়েছিলেন আশীর্বাদ, ‘জাগিয়ে দে রে চাবুক মেরে, আছে যারা অর্ধচেতন।’ অর্ধ-সাপ্তাহিক অর্ধচেতনদের জাগিয়ে তুলবে, এমন শব্দের খেলার অর্থময়তার সঙ্গে চাবুক মারার যে ডাক তা রাবীন্দ্রিক নয়, নজরুলীয়, সেই বিপরীত ধারার প্রতি কবির মান্যতাই এখানে প্রকাশ পায়। ‘ধূমকেতু’র সম্পাদকীয়তে নজরুল লিখলেন, ‘ধূমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়, মানুষ-ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়েওর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। যার নিজের ধর্মে বিশ্বাস আছে, যে নিজের ধর্মের সত্যকে চিনেছে, সে কখনও অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।’
অচিরেই নিষিদ্ধ হলো ‘ধূমকেতু’, নজরুল নিক্ষিপ্ত হলেন কারাগারে, ১৯২৪ সাল নজরুলের কাটল গরাদের আড়ালে সশ্রম দণ্ডভোগে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সদ্য-প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গ্রন্থ উৎসর্গ করলেন ‘শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলামকে’। কারাবন্দি কোনো অনুজ উদীয়মান কবির প্রতি অগ্রজের এমন ভালোবাসা এক বিরল উদাহরণ।
১৯২৬ সালে নেমে এসেছিল দুর্দিন। চিত্তরঞ্জন দাশ প্রয়াত, হিন্দু-মুসলমানের মিলনসন্ধি বেঙ্গল প্যাক্ট ধুলোয় গড়াগড়ি দিচ্ছে, তখনই বেধেছিল ভয়াবহ দাঙ্গা। সেই দাঙ্গার উত্তেজনার মধ্যে কৃষ্ণনগরে আয়োজিত প্রাদেশিক সম্মেলনে নজরুল প্রকাশ্য সভায় গাইলেন তাঁর সদ্যরচিত গান, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ পেরিয়ে বাঙালির মিলনমন্ত্র উচ্চারণে সদাব্রতী ছিলেন নজরুল, তবে এই পথে আঘাত এসেছে বারবার, তবু অবদমিত হননি কবি। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেটে মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রাদেশিক সম্মিলনীতে যোগ দিয়েছিলেন নজরুল। তাঁর আগমন ভন্ডুল করার জন্য টাউন হলে স্থানীয় মাওলানার নেতৃত্বে আয়োজিত হয়েছিল মাহফিল। উদ্বোধনী অধিবেশনে উদাত্ত কণ্ঠে নজরুল গেয়েছিলেন গান, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, জিজ্ঞাসে কোন জন’। সেই গানই সৃষ্টি করেছিল জোয়ার, দেওয়ান মুহম্মদ আজরফের নেতৃত্বে সিলেটের তরুণেরা দাঁড় করায় প্রতিরোধ। পরদিন জনতার ঢল বয়ে যায় সভাস্থলে, ব্রাহ্ম নারীদের সঙ্গে সিলেটের মুসলিম নারীরাও যোগ দেন নজরুলের কথা ও গান শুনতে।
আমরা কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছি বটে, তবে তাঁর স্বপ্নের বিপরীত সমাজ প্রতিষ্ঠায় নানা তৎপরতাকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছি। ধর্মের নামে চলছে চরম অধর্মাচার, যে দূষিত প্ররোচনা কলুষিত করছে সমাজমানস। কেবল অপর ধর্ম নয়, নিজ ধর্মের মধ্যেও অপর ধারা-উপধারার প্রতি বিদ্বেষ প্রচার ও সংহারক হয়ে ওঠা চলছে দেশজুড়ে। আর পাশাপাশি নারীকে অবদমিত গৃহবন্দি, অবরোধবাসিনী করে রাখার প্রয়াস যেমন বাড়ছে, তেমনি তা থেকে উৎসারিত নারী নিগ্রহ তো বটেই, এমনকি বালিকা ও শিশু ধর্ষণের ন্যক্কারজনক ঘটনা পরিব্যাপ্ত সামাজিক বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে। এই কলুষ ঘৃণা সহিংসতা ধর্মান্ধতার কৃষ্ণমেঘের নিচে অধর্ম নিজেদের মুখ ব্যদান করছে। এমন দুর্দিনে নজরুলকে আমাদের বড় প্রয়োজন।
- বিষয় :
- কাজী নজরুল ইসলাম
