তাৎক্ষণিক
কুকুরের পর মানুষ– যে মৃত্যু এড়ানো যেত সহজেই
দীপা দত্ত
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ২৩:১০
আজ, ৩ জুন, দুপুরে বাগেরহাটের খান জাহান আলী দিঘির শেষ কুমিরটিকে খাঁচাবন্দি করা হলো। বিশেষ গাড়িতে করে সেটাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে খুলনার বন্যপ্রাণী কেন্দ্রে। এই দিঘিতে কুমির আর মানুষের সহাবস্থানের যে প্রায় ৬০০ বছরের ইতিহাস ছিল, আজ তার সমাপ্তি ঘটল।
ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটল ঠিকই, পেছনে রয়ে গেল এক বুক হাহাকার। আর কিছু মানুষের চরম অবহেলা। সবাই ভাবছিল সব ঠিকঠাক চলছে। আসলে কিছুই ঠিক ছিল না। প্রকৃতি প্রথম সংকেতটা দিয়েছিল এপ্রিলের শুরুর দিকে।
৮ এপ্রিল এই দিঘির প্রধান ঘাটে একটি কুকুরকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। আর চারপাশ থেকে কুকুরের অসহায় তাকিয়ে থাকার দৃশ্য মুঠোবন্দির প্রতিযোগিতা চলছিল। কুমিরটি সবার সামনে কুকুরটিকে কামড়ে পানির নিচে নিয়ে যায়। সেই শিউরে ওঠা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়। এর প্রতিবাদে প্রাণিপ্রেমী ও সচেতন মহল সোচ্চার হলে এবং সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে কুমিরটি তখন ডিম পাড়া বা বাসা বাঁধার মৌসুমের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে হিংস্র ও আক্রমণাত্মক ছিল।
কাণ্ডজ্ঞান কী বলে? হিংস্র বন্যপ্রাণী যখন লোকালয়ের কাছাকাছি থাকে, তখন মানুষকেই সাবধান হতে হয়। খানজাহান আলীর দীঘির ক্ষেত্রে ঘাটগুলো বন্ধ করতে হতো। কিন্তু আমাদের প্রশাসন শুধু ফাইল নড়াচড়া করতেই ভালোবাসে। তারা তদন্ত করল, কারণ খুঁজল, কোনো ব্যবস্থা নিল না। ঘাটে কোনো সতর্কবার্তা ঝুলল না। কোনো লোহার নেট বসল না। প্রশাসন ভাবল– কুকুরই তো মরেছে, মানুষ তো মরেনি!
এই উদাসীনতার চড়া মূল্য দিতে হলো মাত্র ৫৩ দিনের মধ্যে। গত ১ জুন রাতে দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নামে আট বছরের শিশু ফাতেমা। সেই হিংস্র কুমির এবার শিশুটিকেই টেনে নিয়ে গেল জলের গভীরে। ফাতেমার চিৎকারে আশপাশে থেকে অনেকে ছুটে এলো। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
এই নৃশংস ঘটনার পর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কুমিরটিকে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হলো বটে; এই পদক্ষেপ অনেক দেরিতে নেওয়া হলো। দুই মাস আগের স্পষ্ট বিপৎসংকেতটিকে প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষ আমলে নিলে নিষ্পাপ শিশুটিকে প্রাণ দিতে হতো না। এপ্রিল বা মে মাসেই কাজটি করলে আজ ফাতেমা বেঁচে থাকত।
দিঘিটিতে কুমির ও মানুষের প্রায় ৬০০ বছরের সহাবস্থানের ঐতিহ্য ঐতিহাসিক। জানা যায়, সুফি সাধক হজরত খান জাহান আলী (রহ.) এই দিঘি খনন করার পর ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে দুটি মিঠাপানির কুমির ছাড়েন। তাদের বংশধররাও একই নামে পরিচিত ছিল। যুগের পর যুগ ধরে ভক্তরা মানত পূরণ করতে দিঘির কুমিরকে হাঁস-মুরগি খাইয়ে এসেছেন।
অনেকেরই অজানা, আদি সেই বংশের শেষ কুমিরটি ২০১৫ সালে মারা যায়। ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজের ‘ক্রোকোডাইল ব্যাংক’ থেকে ছয়টি কুমিরের বাচ্চা এনে দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল। সর্বশেষ কুমিরটিও আজ সরিয়ে নেওয়া হলো। ছয় শতাব্দীর ঐতিহ্যের দৃশ্যত অবসান ঘটল।
আরেকবার প্রমাণ হলো, বন্যপ্রাণীর হিংস্র স্বভাব আর মানুষের অসচেতনতা যেখানে মিলেমিশে যায়, সেখানে কঠোর নজরদারি ছাড়া ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।
দীপা দত্ত: সংবাদকর্মী
