ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

এলডিসি থেকে উত্তরণ

তিন বছর বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট সুপারিশ চায় বাংলাদেশ

তিন বছর বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট সুপারিশ চায় বাংলাদেশ
×

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল শুক্রবার জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সভাপতি লোক বাহাদুর থাপার সঙ্গে বৈঠক করেন (ছবি-সংগৃহীত)

 মেসবাহুল হক 

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে টেকসই ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছ থেকে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সুপারিশ চেয়েছে বাংলাদেশ। সরকার বলছে, অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে আজ ও আগামীকাল অনুষ্ঠেয় ইকোসকের সভায় বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে প্রস্তুতিকাল কত দিনের জন্য বাড়ানো যায়, তার সুপারিশ করা হবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের আবেদন জানায়। গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক চিঠিতে এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্যক্তিগত সহযোগিতা চান। গত জুনে সিডিপি বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর আবেদনকে সমর্থন জানালেও কত দিনের জন্য সময় বাড়ানো উচিত, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সুপারিশ করেনি।

এমন প্রেক্ষাপটে ইকোসকের বৈঠক সামনে রেখে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে। গত শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইকোসকের সভাপতি ও নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহসভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রণীত কৌশলপত্র তুলে ধরেন। 

বাংলাদেশের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। এর আগে গত ২ জুলাই ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এবং ৯ জুলাই নেপালের কাঠমান্ডুতে ইকোসকের সভাপতির সঙ্গে একই বিষয়ে আলোচনা হয়।

এসব বৈঠকে সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশি ও বৈশ্বিক নানা অভিঘাতের কারণে অর্থনীতি একাধিক সংকটের মুখে পড়ে। ফলে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের নীতি হলো— উত্তরণের কারণে কোনো দেশের অর্জিত উন্নয়ন যেন ব্যাহত না হয়। কিন্তু গত চার বছরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতিতে উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত। 

সরকার আরও বলেছে, নতুন প্রশাসন একটি নাজুক অর্থনীতি পেয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন। তাই তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা নয়; বরং সুষ্ঠু, সুপরিকল্পিত ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে জাতিসংঘের সিডিপির সুপারিশ এখন ইকোসক বিবেচনা করবে। তবে ইকোসক সিডিপির সুপারিশের পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর মতামত ও সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনা করবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে। তাই সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। 

তিনি বলেন, সম্প্রতি সরকার উন্নয়ন সহযোগী ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর বিষয়ে ইকোসক যে সুপারিশ করবে, তার ভিত্তিতেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে ইকোসক কত বছরের জন্য সময় বাড়ানোর সুপারিশ করে, তা পরবর্তী প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। 
তিনি বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের সামনে সংস্কারের বিকল্প নেই। বিশেষ করে কাস্টমস কার্যক্রমকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও দক্ষ করতে হবে। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমদানি-রপ্তানি-সংক্রান্ত সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা এক দিনের মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন

×