ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন

ভারতে জেন-জির পর জেন আলফার উত্থান

ভারতে জেন-জির পর জেন আলফার উত্থান
×

ছবি: অভিজিৎ দীপকে

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৫৩

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সামুই ভাটপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ক্লাস শুরুর সময় পেরিয়ে গেলেও ১২২ শিক্ষার্থীর কেউ শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেনি। কারণ, তারা স্কুল কর্তৃপক্ষকেই কিছু শেখাতে চায়। নতুন ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা শ্রেণিকক্ষে ঢুকবে না বলে জানায়। কয়েকজনের হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকা।

বিদ্যালয়টির বর্তমান ভবন পুরোনো ও জরাজীর্ণ। ভবনের একটি অংশ এখনও ধ্বংসস্তূপ। ২০২৩ সালে একটি দেয়ালধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার পরও মেরামত করা হয়নি। এর পর থেকেই নিরাপত্তার জন্য নতুন ভবনের দাবি জানিয়ে আসছিল শিশুরা। কিন্তু তাদের কথায় কেউ গুরুত্ব দেয়নি। শেষ পর্যন্ত গত ২২ আগস্ট তারা এমন এক প্রতিবাদের আয়োজন করে, যা ছিল অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। ১০ বছরের বেশি বয়স নয়– এমন শিশুরাই স্কুল ও সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামে।

শিশুদের ধর্মঘট করার খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিদ্যালয়ে ছুটে যান এবং শিগগিরই নতুন ভবন নির্মাণ হবে বলে শিশুদের আশ্বাস দেন। এর পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে রাজি হয় শিক্ষার্থীরা।

মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশসহ ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যে গত জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে বিভিন্ন স্কুলে একই ধরনের প্রতিবাদ হয়েছে। এসব খবর এসেছে মূলত গ্রামীণ এলাকাগুলো থেকে, যেখানে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় হয়ে উঠছে। এসব প্রতিবাদ শুধু শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ নয়; একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্যও নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, তরুণদের সমর্থন ধরে রাখতে সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা অধিকারকর্মী আকাশ সরকার বলেন, ‘শিশুরা যদি অনুকূল পরিবেশে সঠিক শিক্ষা না পায়, তাহলে ভারতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।’

জেন-জি থেকে জেন আলফা
গত জুন মাসের শুরু থেকেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান স্থান যন্তরমন্তরে জড়ো হতে শুরু করেন হাজারো জেন-জি তরুণ। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে কয়েক ডজন তরুণ ভারতীয়র আত্মহত্যার ঘটনাও সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছিল।

কিন্তু মোদি সরকার বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে তাদের বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট উগ্রপন্থি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। এতে ক্ষমতাসীনদের প্রতি বিক্ষোভকারীদের প্রশ্ন আরও বাড়তে থাকে। ভারতের ব্যাপক বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকটও বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। এই তরুণ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।

নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমনপীড়ন চালায়। এর পর জেন-জিদের এই আন্দোলন দেশজুড়ে ব্যাপক জনসমর্থন পেতে শুরু করে। এক পর্যায়ে বিজেপি নেতা ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এর পর সিজেপি ভারতের স্কুলগুলোর দুরবস্থার দিকে নজর দেয়।

সামুই ভাটপুরওয়ার শিক্ষার্থীদের মতো স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করছে, যা ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে খুব একটা দেখা যায় না। জেন-জির বিক্ষোভের পরপরই শুরু হওয়া এই নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদকে অনেকেই ‘জেন আলফা আন্দোলনের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন।

স্কুলগুলোতে চলমান প্রতিবাদ ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আজ যারা স্কুলে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে, তাদের অনেকেই ২০২৯ সালে ভোট দেওয়ার বয়সে পৌঁছে যাবে। ওই বছর ভারতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। খবর আলজাজিরার।

আরও পড়ুন

×