ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

গবেষণা

ডেঙ্গুর ধরন পাল্টেছে, সংক্রমণ-মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে

এ বছর ৯১ শতাংশ রোগীর শরীরে ডেনভ-৩

ডেঙ্গুর ধরন পাল্টেছে, সংক্রমণ-মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে
×

মশা (ফাইল ফটো)

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চার বছর ধরে দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ধরন (সেরোটাইপ) ছিল ডেনভ-২। তবে চলতি বছর সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন আধিপত্য দেখা যাচ্ছে ডেনভ-৩ সেরোটাইপের। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, এ বছর বিশ্লেষণ করা নমুনার ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে ডেনভ-৩ ও ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেনভ-২ শনাক্ত হয়েছে। অন্য কোনো সেরোটাইপ পাওয়া যায়নি।

এদিকে, সারাদেশে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে ১৬ জুলাই এক দিনে সর্বোচ্চ দুজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭২ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর সেরোটাইপে এমন পরিবর্তন বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারণ, আগে ডেনভ-২-এ আক্রান্ত হয়ে যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল, তারা এখন ডেনভ-৩-এ নতুন করে আক্রান্ত হতে পারেন। দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। আইইডিসিআর জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ৭১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে এ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, চলতি বছরে ডেনভ-৩-এর স্পষ্ট আধিপত্য রয়েছে।

রোগতত্ত্ববিদরা জানান, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে। এগুলো হলো ডেনভ-১, ডেনভ-২, ডেনভ-৩ ও ডেনভ-৪। একজন ব্যক্তি একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু অন্য সেরোটাইপে আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। দ্বিতীয়বার সংক্রমণে গুরুতর ডেঙ্গুর আশঙ্কা বেশি থাকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এতদিন দেশে ডেনভ-২-এর আধিপত্য থাকায় অনেক মানুষের শরীরে ওই ধরনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন ডেনভ-৩ বেশি ছড়ালে সেই অ্যান্টিবডি সুরক্ষা দিতে পারবে না। ফলে আগে ডেনভ-২-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন এবং তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুতর রোগী সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে।

আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ডেনভ-৩ সেরোটাইপের কারণে রোগীদের মধ্যে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে হবে। পাশাপাশি বাসাবাড়ির আশপাশে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

আইইডিসিআরের দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের আধিপত্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেনভ-১ ও ডেনভ-২ বেশি ছিল। ২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় আক্রান্তের প্রায় ৯০ শতাংশের শরীরে ডেনভ-৩ শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় আবার ডেনভ-২ সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ৭০ শতাংশে ডেনভ-২ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে তা কমে ৪৮ শতাংশে নামে। কিন্তু চলতি বছরে ঢাকায় সংগৃহীত নমুনার ৯১ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ডেনভ-৩ শনাক্ত হয়েছে, যা ভাইরাসের ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আইইডিসিআরের গবেষকরা বলছেন, অতীতেও সেরোটাইপের পরিবর্তনের পর ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বড় আকারে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবারও ডেনভ-৩-এর দ্রুত আধিপত্যকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডেঙ্গু নজরদারি আরও জোরদার করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দেওয়া এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে একজন বরিশাল বিভাগের, একজন খুলনা বিভাগের এবং একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। এ ছাড়া একই সময়ে বরিশাল বিভাগে ৬৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৪, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১০৩, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২২, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৫২, খুলনা বিভাগে ৪৩, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১, রাজশাহী বিভাগে ৪ এবং রংপুর বিভাগে ছয়জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন মোট ১০ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ ও ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ নারী। এ পর্যন্ত ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯ হাজার ৭৮৬ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে জুলাই মাসে। মাসটির প্রথম ২০ দিনে সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৭৫৩ জন।

 

আরও পড়ুন

×